মোঃ কায়সার হামিদ (জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার)
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালের মঞ্চ প্রস্তুত। ২০ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত একটায় নিউ ইয়র্কের মেট লাইফ স্টেডিয়ামে ফুটবলের বিশ্বজয়ের লড়াইয়ে নামবে আর্জেন্টিনা আর স্পেন। একদিকে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন, অন্যদিকে কোপা আমেরিকা আর বিশ্বকাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন। আক্ষরিক অর্থেই ইউরোপ আর ল্যাটিনের ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। সেই লড়াইয়ে জিতবে কে , জানার জন্য আমাদের সবাইকে আর মাত্র ২৪টি ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে।
বলার অপেক্ষা রাখে না , চলতি বিশ্বকাপে সবচেয়ে ধারাবাহিক আর যোগ্য দুটি দল ফাইনালে খেলছে। স্পেন দিয়ে শুরু করি। প্রথম ম্যাচে নবাগত কেপ ভার্দের সাথে গোলশূন্য ড্র করা ছাড়া কোন ম্যাচে স্পেন হোঁচট খায়নি। নকআউট পর্বে শুরুতে অস্ট্রিয়া ছাড়া পর্তুগাল, বেলজিয়াম আর ফ্রান্সকে হারিয়েছে লা রোজা ফুরিওরা। তিনটি দলই ফিফা র্যাংকিংয়ের শীর্ষ ১০-এ অবস্থান করছে। অর্থাৎ স্পেনের ফাইনালে উঠে আসার পথ সহজ ছিল না। কিন্তু হিসেবী ফুটবলে বড় সব বাধা পেরিয়ে স্পেন দল সেমিফাইনালে।
স্পেনের সবচেয়ে শক্তি তাদের রক্ষণভাগ। গোলরক্ষক উনাই সিমন মাত্র ১টি গোল হজম করেছেন। বিশ্বকাপে রেকর্ড ৬৪৯ মিনিট কেউ কোন গোল দিতে পারেন নি। উনাই সিমন শুধু ‘গোল্ডেন গ্লোভ’ না, বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের ‘গোল্ডেন বল’ এ্যাওয়ার্ডের দাবিদার। তরুণ পেদ্রো পোরো, পাউ কুবারিস , লাপর্তে আর কুকুরেয়াদেড় রক্ষণভাগ ইস্পাতকঠিন। রদ্রি, ফ্যাবিয়ান রুইজ আর ড্যানি ওলমোদের মধ্যমাঠ কিংবা অ্যালেক্স বায়েনা আর লামিনে ইয়ামালদের উইং দিয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভাঙার ক্ষমতা সবাই দেখেছে ফ্রান্সের বিপক্ষে। এটা সত্যি, স্পেন দলে সত্যিকার অর্থে একজন নাম্বার নাইন কিংবা আউট এন্ড আউট ফরোয়ার্ড নেই। কিন্তু পাঁচ গোল করা ওরাইজাবাল নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করেছেন। বিশ্বকাপে পাঁচ গোল করা চাট্টিখানি কথা না। আর স্পেন কখনই প্রথাগত স্ট্রাইকারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে খেলে না। তবু ২০১০ সালের বিশ্বকাপজয়ী দলের ডেভিড ভিয়ার ভূমিকায় নেমেছেন ওরাইজাবাল।
স্পেনের খেলার স্টাইল বল যতটা সম্ভব মাঝমাঠে দখলে রেখে প্রতিপক্ষের আক্রমণভাগকে নিস্ক্রিয় রাখা। স্পেনের বিপক্ষে হুলিয়ান আলভারেজ, এঞ্জো ফার্নান্দেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার আর পারাদেসদের শক্ত পরীক্ষায় পড়তে হবে। তবে আর্জেন্টিনার একজন লিওনেল মেসি আছেন। আধুনিক ফুটবলের জাদুকর। তিনি এক মুহূর্তে সুযোগ পেলেই ম্যাচের গতিপ্রকৃতি বদলে দিতে পারেন। হয় নিজে করবেন, নতুবা সতীর্থ কাউকে দিয়ে করাবেন গোল। মিশরের বিপক্ষে দুই গোল আর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এক গোলে পিছিয়ে থাকা আর্জেন্টিনাকে ম্যাচ জিতিয়েছেন মেসি। ৩৯ বছরের ছোট মেসিকে যত দেখি অবাক হই। তিনি যেন নতুন করে তারুণ্য ফিরে পেয়েছেন। আট গোলের সাথে চারটি অ্যাসিস্ট তার চলতি বিশ্বকাপে। ২০১৪ আর ২০২২ সালের পর মেসি ফের ‘গোল্ডেন বল’ জয়ের অপেক্ষায়। প্রথম অধিনায়ক হিসেবে ২০১৪ আর ২০২২ সালের পর তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলবেন মেসি। ২১ গোল করে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় মগডালে (যদি স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ২০ গোল করা এমবাপ্পে টপকে না যান)। একজন মানুষের অমরত্ব লাভের জন্য আর কি চাই।
স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে দুর্দান্ত টেকনিশিয়ান । তার অধীনে স্পেন ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ আর উয়েফা নেশন্স লিগ জিতেছে। স্পেনের অনূর্ধ্ব-১৯ আর অনূর্ধ্ব-২১ ইউরো জিতিয়েছেন। ফাইনাল কি করে জিততে হয় ফুয়েন্তে জানেন। আর আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি তো এক কাঠি সরেস। আর্জেন্টিনা দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন ২০১৮ বিশ্বকাপের পর ভঙ্গুর অবস্থায়। যখন মেসিও হতাশায় অবসর নেয়ার পথ খুঁজছেন। সেই হতাশাগ্রস্ত মেসিকে তিনি দিলেন আত্মবিশ্বাস। খুঁজে বের করলেন এমি, এঞ্জো, ম্যাকঅ্যালিস্টারদের। নানা পরীক্ষানিরীক্ষার পর তার দল এখন অপ্রতিরোধ্য। দুটি কোপা, ১টি করে বিশ্বকাপ আর লে ফিনেলিসিমা তিনি এনে দিয়েছেন ট্রফি জিততে ভুলে যাওয়া আর্জেন্টিনাকে। এখন যে কাউকে প্রশ্ন করলে উত্তর আসবে, স্কালোনি আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সেরা কোচ। তিনিই আর্জেন্টিনার ফুটবলকে নতুন জীবন দিয়েছেন। ১৯৩৪ আর ১৯৩৮ সালে ভিত্তরিও পুজ্জোর পর প্রথম ম্যানেজার হিসেবে স্কালোনির সামনে রয়েছে টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের সুযোগ।
স্পেন আর আর্জেন্টিনার ফাইনালে কে জিতবে বলা মুশকিল। ১৯৭২ সালে ইউরো জয়ের পর ১৯৭৪-এর বিশ্বকাপ জিতেছিল জার্মানি। সেই রেকর্ড ছোঁয়ার সুযোগ থাকছে স্পেনের সামনে । আর মেসির সামনে অধিনায়ক হিসেবে টানা দুটি বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস গড়ার হাতছানি। স্কালোনির সামনে ইতালিয়ান পুজ্জোর সমান্তরালে দাঁড়াবার সুযোগ। স্পেন কিংবা আর্জেন্টিনা যেই বিশ্বকাপ জিতুক , ইতিহাস নতুন করে লেখা হবে এটা নিশ্চিত।