বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্যাংকিং খাত বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম গভীর সংকটের মুখোমুখি। ২০২৫ সালকে এ খাতের জন্য “সংকটের বছর” বলে অভিহিত করা হচ্ছে, এবং ২০২৬ সালেও এই চাপ অব্যাহত থাকবে বলে আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংসসহ বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিয়েছেন। খেলাপি ঋণের বিশাল স্তূপ, মূলধনের ঘাটতি, সুশাসনের অভাব, তারল্য সংকট এবং আমানতকারীদের আস্থাহীনতা—এসব সমস্যা শুধু ব্যাংকিং খাতকেই নয়, পুরো অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই আলোচনায় আমরা বর্তমান পরিস্থিতি, কারণসমূহ, প্রভাব এবং সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চিত্র: জাতীয় সংকট
ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো খেলাপি ঋণ (Non-Performing Loans বা NPL)। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬.৪৪ লাখ কোটি টাকা, যা মোট বকেয়া ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ। কোনো কোনো ব্যাংকে এ হার ৬০-৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা সেই ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমকে প্রায় অচল করে দিয়েছে।
এই খেলাপি ঋণের বড় অংশ রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাপুষ্ট বড় করপোরেট গ্রুপের। অতীতে ঋণ বিতরণে অনিয়ম, ইচ্ছাকৃত খেলাপি এবং পুনঃতফসিলীকরণের মাধ্যমে সমস্যা লুকিয়ে রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেক ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যে আসায় সংকট আরও স্পষ্ট হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ বিতরণে অনীহা দেখাচ্ছে, যা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। ২০২৬ সালের প্রথম দিকে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হয়েছে।
মূলধন ঘাটতি ও তারল্য সংকট
অনেক ব্যাংক, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ও কিছু ইসলামি ব্যাংক, মূলধনের ঘাটতিতে ভুগছে। ক্যাপিটাল অ্যাডিকুয়েসি রেশিও (CAR) অনেক ক্ষেত্রে ন্যূনতম সীমার নিচে নেমে গেছে। তারল্য সংকটও তীব্র—আমানতকারীরা আস্থা হারিয়ে টাকা তুলে নিচ্ছেন, ফলে ব্যাংকগুলোকে উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
উচ্চ সুদের হার (পলিসি রেট ১০% এবং ঋণের সুদ ১৪-১৫%) ব্যবসা-বাণিজ্যকে নিরুৎসাহিত করছে। এতে বিনিয়োগ কমছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়ছে। বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই খাতের অস্থিরতাকে বাজেট বাস্তবায়নের বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সুশাসনের অভাব ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতার মূলে রয়েছে সুশাসনের ঘাটতি। রাজনৈতিক নিয়োগ, বোর্ডে অনুপ্রবেশ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা অনিয়মকে প্রশ্রয় দিয়েছে। জালিয়াতি, অর্থ পাচার এবং দুর্নীতির ঘটনা বারবার সামনে এসেছে। ফলে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক আস্থা ক্ষুণ্ণ হয়েছে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ ঋণ ঝুঁকি, খণ্ডিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং দুর্বল শাসনব্যবস্থার কারণে ২০২৬ সাল পর্যন্ত খাতটি চাপে থাকবে। সম্পদের মানের অবনতি এবং লাভজনকতার দুর্বলতা অব্যাহত থাকবে।
প্রভাব: অর্থনীতির ওপর ঝুঁকি
- বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি হ্রাস: ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে না পারলে শিল্প, এসএমই এবং কৃষি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
• মুদ্রাস্ফীতি ও তারল্য সমস্যা: উচ্চ সুদের হার এবং টাকার অবমূল্যায়ন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে।
• আমানতকারীদের ঝুঁকি: কিছু ব্যাংকে আমানত ফ্রোজেন হওয়ার ঘটনা আস্থা আরও কমিয়েছে।
• এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের চ্যালেঞ্জ: ২০২৬ সালে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করবে, কিন্তু ব্যাংকিং সংকট এ প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে।
সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্যোগ
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সমস্যা সমাধানে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন, মার্জার, উইলফুল ডিফল্টারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ চলছে। বিশ্বব্যাংক ব্যাংক খাত সংস্কারে ৪৫ কোটি ডলার ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত স্বাধীন নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং স্বচ্ছতা জরুরি।
সমাধানের পথ: সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা
১. খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার: আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঋণ আদায় এবং উইলফুল ডিফল্টারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা।
২. মূলধন পুনর্গঠন: রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন এবং প্রয়োজনে মার্জার।
৩. ডিজিটালাইজেশন ও স্বচ্ছতা: ফিনটেক, এআই-ভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং রিয়েল-টাইম মনিটরিং চালু।
৪. সুশাসন: ব্যাংক বোর্ডে যোগ্যতাসম্পন্ন সদস্য নিয়োগ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তকরণ।
৫. আমানতকারী সুরক্ষা: ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স স্কিমকে শক্তিশালী করা।
৬. নীতি স্থিতিশীলতা: সুদের হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি।
বিশ্ব প্রেক্ষাপটে ব্যাংকিং খাত এআই, ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন, সাইবার নিরাপত্তা এবং সাসটেইনেবল ফাইন্যান্সের দিকে এগোচ্ছে। বাংলাদেশও এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারে যদি মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধান করা যায়।
ব্যাংকিং খাতের সংকট শুধু আর্থিক নয়, এটি একটি জাতীয় সংকট। এর সমাধান না হলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে পড়বে। সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংকার এবং অর্থনীতিবিদদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় স্বচ্ছ, শক্তিশালী ও আস্থাভাজন ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। ২০২৬ সালকে যদি সংস্কার ও উত্তরণের বছর হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারবে। সময় এখনই—দেরি হলে খরচ অনেক বেশি হবে।