রাষ্ট্র একটি বড় বিষয়। কোনো ব্যক্তি, পরিবার, গোষ্ঠী কিংবা সম্প্রদায়ের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে রাষ্ট্র চলতে পারে না। কারণ, বহু ধর্ম, বর্ণ ও ভাষার মানুষ বসবাস করে থাকে রাষ্ট্রে। তাই রাষ্ট্র নেতাদের খেয়াল রাখতে হয় সবার প্রতি। এজন্য রাষ্ট্রে রচিত হয় সংবিধান। সংবিধানের আলোকেই রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক রাষ্ট্রেই সংবিধানকে সম্মান করা হয় না। সংবিধানকে মান্য না করলে রাষ্ট্রে নাগরিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না, বিশেষ করে সংখ্যালঘুরা হয় বঞ্চিত। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে এই বিষয়টি বেশ স্পষ্ট। অথচ দেশটির সংবিধানে ‘বৈচিত্র্যের ঐক্য’ দর্শনকে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টিকে বিজেপি সরকার গুরুত্ব দিলে তো সেখানে সংখ্যা লঘু মুসলমানদের অধিকার হারা হয়ে এমন দুর্দশায় পড়তে হতো না। বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)-এর প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জাতিগত বাঙালি, বিশেষ করে মুসলমান বাঙালিদের কোনো প্রকার মৌলিক প্রক্রিয়া ছাড়াই জোর করে তাড়িয়ে দিচ্ছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। বিতাড়িত এই বাসিন্দাদের ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) বাংলাদেশ সীমান্তে ঠেলে দিচ্ছে। অপরদিকে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বিজিবি এসব ভারতীয়দের বাংলাদেশে প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। ফলে বিতাড়িত বহু পরিবার দুই দেশের মধ্যবর্তী ‘শূন্য রেখায়’ অবস্থান নিতে বাধ্য হচ্ছে। গত মঙ্গলবার এইচআরডব্লিউ-এর প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বিজিবির বরাত দিয়ে জাননো হয়, গত ১ জুন থেকে ভারতের দুশ’র বেশি লোককে পুশইনের ২১টি চেষ্টা রুখে দিয়েছে তারা। গত মার্চে প্রাদেশিক নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। এর পরপরই তিনি ঘোষণা করেন, তার সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির আওতায় শত শত ‘বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীকে’ আটক করা হয়েছে। এ ধরনের প্রায় পাঁচ হাজার লোককে ‘ফেরত যেতে’ বাধ্য করা হচ্ছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপ-পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নিষ্ঠুরভাবে পরিবারগুলোকে তাদের মৌলিক মানবাধিকার উপেক্ষা করেই বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে বা সীমান্তে আটকে রেখে দিচ্ছে। সরকারকে অবৈধভাবে লোকজনকে বিতাড়ন বন্ধ করতে হবে, যথাযথ আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নাগরিকত্ব নিশ্চিতের বিষয়ে সমন্বয় করতে হবে এবং মুসলমানদের লক্ষ্য করে এই উদ্বেগজনক শত্রুতার অবসান করতে হবে।’ হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ৯ প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে। তারা বলেছেন, বিএসএফ সদস্যরা দলে দলে মানুষকে সীমান্তে এনে রাতে কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে বিজিবি প্রবেশে বাধা দিলে পরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা সেই মানুষদের আবার ফিরে যেতে দেয়। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত মার্চে প্রাদেশিক নির্বাচনের আগে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় দ্রুত ও বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় ৯০ লাখেরও বেশি নাম বাদ দেওয়া হয়। এতে আটক ও বহিষ্কারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর আগে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আসামে ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব যাচাই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রহীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছিল ১৯ লাখের বেশি মানুষ। এইচআরডব্লিউ বলেছে, পশ্চিমবঙ্গে শত শত সন্দেহভাজন অভিবাসীকে আটক কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই মুসলিম, কিছু হিন্দুও রয়েছেন। অনেকের ক্ষেত্রে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়াই গ্রেফতার ও আটকের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ এই ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়াটিই ছিল বিতর্কিত, যার বিশেষ টার্গেট ছিল পশ্চিবঙ্গের বাঙালি মুসলমানরা। এমন সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি কি কোনো রাষ্ট্রের জন্য সঙ্গত হতে পারে? ভারতকে এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে হবে।