ড. মো. নূরুল আমিন

॥ তৃতীয় কিস্তি ॥

আমার সাংবাদিক জীবনের নানা কারণে অত্যন্ত মোড় পরিবর্তনকারী সময় ছিল ১৯৭১ ও ১৯৭২। ঘটনাবহুল এ সময়েই উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা বা দুর্ঘটনা ছিল স্বাধীনতা-উত্তর পরিস্থিতিতে। এহতেশাম হায়দার চৌধুরীর পুরানা পণ্টনের বাসায় পূর্ব দেশের আমার পুরাতন সহকর্মীদের সাথে আমার কনফ্রন্টেশন যা আমি গত কিস্তিতে উল্লেখ করেছিলাম এবং বলেছিলাম যে নার্গিস রফিকা বানু হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে দাঁড়িয়ে গিয়ে আমার পক্ষাবলম্বন করেছিলেন। তার মধ্যস্থতায় ঐদিন এক শর্তে তারা আমাকে তাদের জিঘাংসা থেকে রেহাই দিয়েছিলেন এবং সে শর্তটা হচ্ছে ভবিষ্যতে আমি আর প্রত্যক্ষ সাংবাদিকতা পেশায় জড়িত হতে পারবো না। প্রতিকূল পরিবেশ এ অসম ও অপমানকর শর্ত আমাকে মেনে নিতে বাধ্য করেছিল। নার্গিস এবং এহতেশাম আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন যে, তারা আমার আর কোনো ক্ষতি হতে দেবেন না। আমি উত্তর শাহজাহানপুরে আমার কাজিনের বাসায় ফিরে এলাম। ঐ সময়টি আমার জন্য ছিল অত্যন্ত খারাপ। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহিনী ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এ বছর নভেম্বর মাসে ছিল ঈদুল ফিতর। নয় মাস পর ঈদের ছুটি নিয়ে বাড়ি গেলাম। অভিভাবকরা তিন-চার বছর ধরেই বিয়ের জন্য পীড়াপীড়ি করছিলেন, আমি রাজি হচ্ছিলাম না। সাবেক আমীরে জামায়াত মকবুল আহমদ তখন ফেনী মহকুমা আমীর। তিনি উদ্যোগ নিলেন শক্ত হাতে। বাবা আগে থেকেই তৈরি ছিলেন। আবার বড় মামা ও ছোট নানা উভয়েই আমাদের বাড়িতে।

বড় মামা সাতক্ষীরা জেলার বুধহাটা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন এবং ঈদ উপলক্ষে বাড়ি এসেছিলেন। নভেম্বরের ২৪ তারিখ বাদ আসর একেবারেই অনাড়ম্বরভাবে ফেনী রেজিস্ট্রি অফিস সংলগ্ন মকবুল চাচার বাবায় আমার বিয়ে সম্পন্ন হয়। কনে ফেনী সরকারি পাইলট হাইস্কুলের শিক্ষক জামায়াতের প্রবীণ রুকন জনাব আবুল খায়ের সাহেবের কন্যা খায়রুল আছমা বেগম। আমরা যখন ইজাব কবুল করছিলাম তখন ফেনী বর্ডারে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। ঐদিনই ভারত-পাকিস্তান অঘোষিত যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। পরদিন ভোরে আমি ঢাকা রওয়ানা হয়েছিলাম, সাথে ছিল আমার ছোট ভাই। মুক্তিবাহিনী ভৈরব ব্রিজ ধ্বংস করে দেয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম সরাসরি রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে ফেনী থেকে ট্রেন যোগে আমাদের চাঁদপুর আসতে হয়, সেখান থেকে স্টীমারে ঢাকা। আমার বাসা ছিল ৩/২ শরৎ চক্রবর্তী রোড, আরমানিটোলায়। দেশ স্বাধীন হয় ১৬ ডিসেম্বর। আমি ২১ ডিসেম্বর মা-বাবা, স্ত্রী-পরিজনের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য গ্রামের বাড়িতে যাই।

আমার ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী দৈনিক সংগ্রামের সহকারী সম্পাদক মাওলানা জুলফিকার আহমদ কিসমতি ১৮ তারিখেই গ্রামের বাড়িতে চলে যান। ১৯ তারিখ থেকেই আমাদের পাড়ায় মুক্তিবাহিনীর নামে আওয়ামী লীগ, ছাত্রল লীগ ও যুবলীগের ব্যাপক লুটপাট শুরু হয়েছিল। কয়েকটি অবাঙালি পরিবারের ওপর হামলা করে তাদের ঘরবাড়ি লুট করা হয় এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করা হয়। আমার অনুপস্থিতিতে আমার বাড়িটিও তারা দখল করে নেয়। দখলকৃত বাড়িটির ওপার আওয়ামী লীগ এমএনএ ও শেখ মুজিবের প্রথম মন্ত্রিসভার এলজিআরডিমন্ত্রী মতিয়ূর রহমানের শ্যান দৃষ্টি পড়েছিল এবং তিনিই তা দখল করে নিয়েছিলেন। সারা দেশে এই দখলবাণিজ্য চলেছে। আমার সাংগঠনিক বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীদের মধ্যে চৌধুরী মুঈন উদ্দিন হুমকির মুখে প্রাণ ভয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। অবজারভারের সিনিয়র সহসম্পাদক সিলেটের জনাব নূরুজ্জামান (যিনি পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের পাবলিসিটি সেক্রেটারিও ছিলেন) পূর্ব দেশের রিপোর্টার ও বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলা বারের সদস্য জনাব হোসেন তওফিক চৌধুরী, আজাদের মোহাম্মদ রকিব এদের কেউই কর্মস্থলে থাকতে পারেননি, সবাইকে আত্মগোপনে চলে যেতে হয়েছিল।

জাতীয় পুনর্গঠন ব্যুরোর পরিচালক অধ্যাপক হাসান জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেনসহ ইসলামী জীবন ব্যবস্থায় বিশ্বাসী ডানপন্থী সাংবাদিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী এবং আলেম-ওলামাদের নির্যাতনের ব্যাপক শিকারে পরিণত হতে হয়েছিল। ইসলামী পুনর্জাগরণের কবি ফররুখ আহমদ রেডিও পাকিস্তানে চাকরি করতেন। ১৬ ডিসেম্বরের পর তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। ১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাসে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি অভাব অনটন ও দারিদ্র্যের মধ্যে কালাতিপাত করেছেন। তার এক ছেলে ডাক্তারি পড়তো। তার পড়ালেখা বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। ইস্পাহানী কলোনীর তার বাসার খরচ চালাতেন সেখানকার এক মুদি দোকানদার। এই ধরনের ঘটনাগুলো আমাকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। পূর্ব দেশে আমি চাকরি হারাই, কায়েদে আজম কলেজের চাকরিও আমার চলে যায়।

আমার মনে আছে, একাত্তরের অক্টোবর মাসে আমরা শিক্ষকরা একদিন অধ্যক্ষ ফাতেমী সাহেবের কক্ষে মিটিং করছিলাম। ঐ সময়ে তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা তোফায়েল আহমদ ও আসম বর কোনোরকম অনুমতি ছাড়াই সেখানে ঢুকে পড়েন এবং বিনা ভূমিকায় প্রস্তাব করেন যে, কলেজের নাম পরিবর্তন করে নজরুল ইসলাম কলেজ করতে হবে। অধ্যক্ষ ফাতেমী অত্যন্ত স্বাধীনচেতা ও ঈমানদীপ্ত ব্যক্তি ছিলেন। তিনি আমাদের অর্থাৎ শিক্ষকদের মতামত চাইলেন। শিক্ষকরা তার ওপর দায়িত্ব অর্পণ করলেন। ফাতেমী সাহেব একটু নড়েচড়ে বসলেন এবং ভাঙা ভাঙা বাংলায় কারণ জানতে চাইলেন। তোফায়েল-রবরা যৌক্তিক কোনো কারণ বলতে পারলেন না। শুধু বলল কায়েদে আজম বাঙালিদের বন্ধু ছিলেন না, আমরা যে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি তাতে কায়েদে আজম জিন্নাহ থাকতে পারেন না। প্রিন্সিপাল সাহেব হেসে দিলেন, বললেন, কায়েদে আজম মুসলমানদের নেতা ছিলেন। তিনি হিন্দু আধিপত্য ও তাদের অত্যাচার থেকে মুসলমানদের রক্ষার জন্য স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ভুল করেননি বরং উপকারই করেছেনÑ আমি তোমাদের দাবি মানি না।

কলেজের নাম কবি নজরুল ইসলামের নামে করা তোমাদের আসল দাবি বলে আমি বিশ্বাস করি না। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি তোমাদের যে লক্ষ্য তা আসল লক্ষ্য নয়। কলেজের নাম পরিবর্তন করে আজ যদি নজরুল ইসলাম কলেজ করা হয়, কিছুদিন পর তোমরাই দাবি করবে যে, এ নামও পরিবর্তন করে Tagore College বা কবি রবীন্দ্রনাথ কলেজ করা হোক। কেননা, এটাই তোমাদের আসল লক্ষ্য। তোফায়েল-রবরা সেদিন খালি হাতে ফিরে গিয়েছিল। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর উপমহাদেশের এই খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ ও ইসলামী চিন্তাবিদকে আপমানকরভাবে বিতাড়ন করা হয়। সেখান থেকে আমিও বিতাড়িত হই এবং অন্য যারা বিতাড়িত হয়েছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক হাবিবুর রহমান (চাঁদপুর), ইসলামী ইতিহাসের অধ্যাপক হেলালুদ্দিন (বরিশাল), বাংলার অধ্যাপক আখতার ফারুক (বরিশাল, তিনি দৈনিক সংগ্রামেরও সম্পাদক ছিলেন), উর্দুর অধ্যাপক ফররুখ আহমদ, অর্থনীতির অধাপক নূরুল আফসার। এদের প্রায় সবাই জামায়াতের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। চাকরি বা জীবিকার উৎস হারালে কি হয় তা সামান্য নজির কবি ফররুখ আহমদের পরিবারের দুরাবস্থা থেকে আমরা জানতে পারি।

প্রশ্ন হচ্ছে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে আমি কী করলাম। নার্গিস রফিকা বানুর মধ্যস্থতায় ভবিষ্যতে প্রাতিষ্ঠানিক সাংবাদিকতায় ফিরে না আসার শর্তে ফিরে আসলাম। কিন্তু বানর তো গাছে ওঠা বন্ধ করতে পারে না। ঠিক করলাম, আমার ছদ্মনাম বা কলমী নাম বৈরাম খাঁ-ই এখন থেকে আশ্রয় হবে। ১৯৭২ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রামের বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় বৈরাম খাঁ ছদ্মনামে আমার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। দৈনিক সংগ্রাম প্রকাশনার দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৯৭৭ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত দৈনিক সংগ্রাম থেকে আমি কোনো সম্মানি নেইনি। আগামী কিস্তিতে আমি একাত্তরের পরিস্থিতিতে আমরা কিভাবে কাজ করেছি এবং আমার সরকারি চাকরি অবস্থায় সংবাদপত্রে ভূমিকা পালন নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করার আশা রাখি। (চলবে)