মো. রাশেদুল হাসান আমিন

পরাক্রমশালী সামরিক শক্তির অহংকার যখন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার দেয়াল স্পর্শ করে, তখন ইতিহাসের চাকা আবারও একই বৃত্তে ফিরে আসে। বিগত শতকের সত্তরের দশকে ভিয়েতনামের সায়গনে যা ঘটেছিল, চলতি শতকের শুরুতে আফগানিস্তানের কাবুলেও তার কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। সামরিক ইতিহাসের পাতায় মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর এ দুই বিদায় বা তথাকথিত ‘পলায়ন’ কেবল দুটি পরাজয়ের গল্প নয়; বরং তা শক্তির সীমাবদ্ধতা এবং ভুল রণকৌশলের এক চিরন্তন দলিল।

১৯৭৫ সালের ৩০ এপ্রিল, উত্তর ভিয়েতনামী বাহিনী যখন সায়গন অবরুদ্ধ করে ফেলে, তখন মার্কিন সিআইএ এবং সামরিক বাহিনী ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম ও বিশৃঙ্খল উদ্ধার অভিযান ‘অপারেশন ফ্রিকোয়েন্ট উইন্ড’ পরিচালনা করে। সায়গনের মার্কিন দূতাবাসের ছাদ থেকে একটি সরু সিঁড়ি বেয়ে আতঙ্কিত মানুষের হেলিকপ্টারে ওঠার সেই ঐতিহাসিক ছবি আজ অবধি আমেরিকার সামরিক অহমিকার পতনের সবচেয়ে বড় প্রতীক। পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল যে, উদ্ধারকারী মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলোতে নতুন হেলিকপ্টার নামানোর জায়গা খালি করতে কোটি কোটি ডলার মূল্যের সচল চপারগুলোকে ধাক্কা দিয়ে সাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।

ঠিক ছেচল্লিশ বছর পর, ২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে প্রায় একই নাটকীয় দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। কোনো পূর্ব ঘোষণা বা আফগান মিত্রদের না জানিয়েই গভীর রাতে মার্কিন সেনারা তাদের প্রধান ঘাঁটি বাগরাম এয়ারফিল্ডের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে চুপিসারে চলে যায়। আর ১৫ আগস্ট কাবুল বিমানবন্দর যখন হাজার হাজার আতঙ্কিত মানুষ অবরুদ্ধ করে ফেলে, তখন মার্কিন সামরিক কার্গো বিমান সি-১৭ রানওয়ে দিয়ে জোরপূর্বক উড্ডয়ন শুরু করে। বিমানের ডানা ও চাকার ওপর চেপে বসা বেশ কয়েকজন আফগান নাগরিক আকাশ থেকে নিচে পড়ে মারা যান। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে দাবি করেছিলেন, “এটি সায়গন নয়, কাবুলের ছাদ থেকে হেলিকপ্টারে করে মানুষকে সরিয়ে নেয়া হবে না।” কিন্তু বাস্তবে ঠিক তার উল্টোটিই ঘটেছিল। এ দুই ঐতিহাসিক পলায়নের ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের জুনে এসে পারস্য উপসাগরে আমরা মার্কিন সামরিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যের আরেকটি ভিন্নরূপী, অথচ সমান্তরাল কৌশলগত পরাজয় প্রত্যক্ষ করলাম।

আমেরিকার এমন সামরিক ব্যর্থতা ও ক্ষমতার অহমিকা নিয়ে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সামরিক সাধারণ ও নীতিনির্ধারকরা বিভিন্ন সময়ে তীক্ষè মন্তব্য করেছেন। ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে হ্যানয়ে আমেরিকান কর্নেল হ্যারি জি. সামার্স যখন উত্তর ভিয়েতনামী কর্নেল নগুয়েন ডন তু-কে বলেছিলেন, “তোমরা যুদ্ধক্ষেত্রে আমাদের কখনোই হারাতে পারোনি”, তখন ভিয়েতনামী কর্নেল জবাব দিয়েছিলেন, “তা হয়তো সত্যি, কিন্তু সেটি এখানে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক।” এ একটি বাক্যই প্রমাণ করে যে, কেবল সমরাস্ত্রের শক্তিতে যুদ্ধ জেতা যায় না, যদি না তার কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য থাকে। একইভাবে, ওয়াশিংটন পোস্টের ‘আফগানিস্তান পেপার্স’-এ প্রকাশিত উক্তিতে আফগান যুদ্ধ চলাকালীন হোয়াইট হাউজের শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা জেনারেল ডগলাস লুট অকপটে স্বীকার করেছিলেন, “আমরা আসলে জানতামই না আমরা আফগানিস্তানে কী করতে এসেছি। দেশটির ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের কোনো মৌলিক ধারণাই ছিল না।”

মার্কিন সেনাবাহিনীর নিজস্ব প্রকাশনা ‘আর্মি ইউনিভার্সিটি প্রেস’-এ আফগান যুদ্ধকে একটি “প্রচণ্ড সামরিক ব্যর্থতা” হিসেবে স্বীকার করে বলা হয়েছে, মার্কিন জেনারেলরা যুদ্ধক্ষেত্রে ছোটখাটো কিছু সাফল্যকে বড় কৌশলগত বিজয় হিসেবে প্রচার করতেন, যা দীর্ঘমেয়াদে কোনো কাজে আসেনি। এ অতি-আত্মবিশ্বাস ও বাস্তবতাবর্জিত রণকৌশলই ভিয়েতনাম এবং আফগানিস্তানের মতো ২০২৬ সালের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধেও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনকে এক শোচনীয় অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে। কিংবদন্তি সামরিক কৌশলবিদ কার্ল ফন ক্লজেভিৎস লিখেছিলেন, “যুদ্ধ হলো অন্য উপায়ে রাজনীতির ধারাবাহিকতা।” যখন যুদ্ধ তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হারিয়ে কেবল শাস্তিমূলক বা অহংকার প্রদর্শনের পদক্ষেপে পরিণত হয়, তখন সেটি অন্তহীন উত্তেজনা ও কৌশলগত বিপর্যয় ডেকে আনেÑযার নিখুঁত প্রমাণ এবারের ইরান যুদ্ধ।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ: সূচনা থেকে চুক্তির পটভূমি : ২০২৬ সালের শুরুর দিকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এক নজিরবিহীন ও বিধ্বংসী যুদ্ধের মুখোমুখি হয়। যুদ্ধের পটভূমি তৈরি হয়েছিল মূলত ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে, যখন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে দ্রুত ও গোপনে ক্ষমতাচ্যুত করার সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে এক চরম আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ করে। ট্রাম্প প্রশাসনের বিশ্বাস ছিল যে, তাদের আক্রমণাত্মক “ম্যাক্সিমাম প্রেসার ২.০” এবং পরবর্তীতে শুরু হওয়া “অপারেশন এপিক ফিউরি”-এর মাধ্যমে উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর আকাশপথের হামলা চালিয়ে ইরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থাকে সহজে ও প্রায় বিনা খরচে উৎখাত করা সম্ভব। এ লক্ষ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র।

যুদ্ধের প্রাথমিক দিনগুলোতে মার্কিন ও ইসরাইলী বাহিনী কিছু অসাধারণ সামরিক সাফল্য অর্জন করে। এর মধ্যে ছিল ইরানের প্রথাগত নৌ-সক্ষমতার পদ্ধতিগত ধ্বংস সাধন এবং এক সুনির্দিষ্ট বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করে দেশটির মূল নেতৃত্ব কাঠামোকে স্তব্ধ করে দেয়া। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ধারণা ছিল, এই তীব্র হামলার পর ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ভেতরে স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান ঘটবে, শাসনব্যবস্থার পতন হবে এবং লেবাননে হিজবুল্লাহসহ আঞ্চলিক প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর শক্তি চিরতরে খর্ব করা যাবে। কিন্তু ধুলোবালি থিতিয়ে যাওয়ার পরপরই মার্কিন প্রশাসনের এ হিসাব সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হয়। বিমান শক্তি ও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড কোনো অভ্যন্তরীণ অভ্যুত্থান ঘটাতে পারেনি, বরং ক্ষমতা দ্রুত আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণকারী এবং যুদ্ধ-অভিজ্ঞ ‘ইসলামিক রেগ্র্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি)-এর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। ইরান কোনো সন্দেহের অবকাশ না রেখেই প্রমাণ করে যে, বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম ধমনী ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দেয়ার পূর্ণ সক্ষমতা তাদের রয়েছে। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র এবং অত্যাধুনিক ড্রোন পারস্য উপসাগরীয় ছয়টি আরব রাষ্ট্র এবং সেখানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানে, যার ফলে আমেরিকার তথাকথিত অভেদ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অসারতা প্রকাশ পায়।

পেন্টাগন যখনই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি ধ্বংসের দাবি করেছে, তখনই আরব রাজতন্ত্রগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর পাল্টা হামলার মাধ্যমে তেহরান তার দৃশ্যমান জবাব দিয়েছে। চার মাসব্যাপী এ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর, ওয়াশিংটন নিজেকে এক গভীর ও যন্ত্রণাদায়ক অর্থনৈতিক ও সামরিক অচলাবস্থার মধ্যে আবিষ্কার করে। কোনো উপায় না দেখে, পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে বাধ্য হয়। গত ১৫ জুন ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ ঘোষণা করে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্জিত সমঝোতার ভিত্তিতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান অবিলম্বে বন্ধ হবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত মার্কিন নৌ অবরোধ তাৎক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হবে। জেনেভায় এই সমঝোতা স্মারক আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার পরই মূলত চার মাসের যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে এক নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে।

ট্রাম্পের কৌশলগত ভুল এবং মার্কিন আধিপত্যের সীমাবদ্ধতা : এ যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রণকৌশল ছিল মূলত চোখধাঁধানো সামরিক শক্তি প্রদর্শন করে সুসংহত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করা, যা ক্যাটো ইনস্টিটিউটের ভাষায়, “একটি কৌশলগত ব্যর্থতাকে আড়াল করার অপচেষ্টা মাত্র”। ট্রাম্পের প্রথম ও প্রধান কৌশলগত ভুল ছিল ইরানের অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধক্ষমতা ও গভীর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণকে খাটো করে দেখা। জেনারেল ওমর ব্র্যাডলির সেই বিখ্যাত মন্তব্যÑ “অপেশাদারেরা কৌশল নিয়ে কথা বলে, কিন্তু পেশাদারেরা কথা বলে রসদ ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সক্ষমতা নিয়ে”Ñ যা ট্রাম্পের ক্ষেত্রে অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। পেন্টাগন ভেবেছিল বিমান হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা গেছে, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ইরানের প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ও মোবাইল উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অক্ষত ছিল, যা তাদের মাটির গভীরে সুরক্ষিত ‘মিসাইল সিটি’-তে সংরক্ষিত থেকে যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।

দ্বিতীয় বড় ভুলটি ছিল বিশ্ব অর্থনীতিতে এ যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া অনুমান করতে না পারা। মার্কিন নৌ অবরোধের জবাবে ইরান যখন হরমুজ প্রণালির ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে মাইন ও বাধ্যতামূলক টোল ব্যবস্থা চালু করল, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। এর ফলে পশ্চিমা বিশ্বে মূল্যস্ফীতির এক নতুন ঢেউ সৃষ্টি হয়। চরম পরিহাসের বিষয় হলো, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে ট্রাম্প প্রশাসন নিজেই নীরবে কিছু তেল-নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে বাধ্য হয়, যার ফলে যে যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল তেহরানের আর্থিক সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া, সেই যুদ্ধের মাঝেই ইরান অপ্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করে। সবচেয়ে বড় কৌশলগত বিপর্যয় ঘটেছে পারমাণবিক ইস্যুতে। যুদ্ধের আগে ইরান কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে অনেক পারমাণবিক ছাড় দিতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু ওয়াশিংটন কূটনীতির জায়গায় অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ সামরিক চাপ প্রয়োগ করায় তেহরানের সামনে শান্তিপূর্ণ সমাধানের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে, যুদ্ধ-পরবর্তী যেকোনো ইরানি সরকার এখন কার্যকর পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতাকে জাতীয় টিকে থাকার জন্য একেবারে অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচনা করবে।

এ যুদ্ধ ও পরবর্তী সমঝোতা স্মারক বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্যের সীমাবদ্ধতাকে নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে। তুলনামূলকভাবে সীমিত সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করেই ইরান খুব বেশি হৈচৈ বা বিপুল ব্যয় ছাড়াই উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর কাছে ওয়াশিংটনের দেয়া নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক নিশ্চয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিয়েছে। বিবিসির অভিজ্ঞ সাংবাদিক জেরেমি বোয়েন লিখেছেন, “ব্যক্তিগত আলোচনায় উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারা ইতোমধ্যেই নিজেদের কৌশলগত সম্পর্ক বৈচিত্র্যময় করার এবং ইরানের সঙ্গে সহাবস্থানের উপায় খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলছেন।” অর্থাৎ, পারস্য উপসাগরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এখন ইরানের কেন্দ্রীয় ভূমিকাকেই আরব বিশ্ব মেনে নিচ্ছে। একই সঙ্গে, এ সমঝোতাটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চিরন্তন মিত্রতার ফাটলকেও সামনে এনেছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা ও ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকায় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এবং এ চুক্তি মানতে অস্বীকৃতি প্রকাশ করেছেন। চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার আগমুহূর্তে বৈরুতে হিজবুল্লাহর কমান্ড সেন্টারে আইডিএফ হামলা চালালে ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন, “নেতানিয়াহুকে এমন একটা হামলা চালানোর দরকারই বা কী ছিল?” যা প্রমাণ করে যে, এ অঞ্চলে মার্কিন ও ইসরাইলি স্বার্থ এখন আর এক জায়গায় নেই।

সবশেষে, এ সংঘাত ওয়াশিংটনের প্রধান ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা তৈরি করেছে। পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক রবার্ট কাগান মন্তব্য করেছেন, এ যুদ্ধ “একটি বিশাল ভুল হিসাবের ফল হিসেবে উত্তর-আমেরিকাকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার দিকে দ্রুততর বৈশ্বিক পুনর্বিন্যাস” সৃষ্টি করেছে। ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার বদলে মার্কিন বাহিনী এমন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছে, যে চীনের উন্নত সেমিকন্ডাক্টর চিপ, তাৎক্ষণিক স্যাটেলাইট চিত্র এবং ড্রোন প্রযুক্তির মতো কৌশলগত সহযোগিতা পেয়ে মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের ব্লকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে চলে গেছে।

এক নতুন শক্তির ভারসাম্য : ১৯ জুন জেনেভায় যখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারকটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হল, তখন ইতিহাসের এক তীব্র বিদ্রƒপাত্মক পরিণতি প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ববাসী। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ যতই দাবি করুন না কেন যে, “এ মহান চুক্তি পুরো অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা বয়ে আনবে”, বাস্তব সত্য হলো এ চুক্তির মূল কাঠামো ২০১৫ সালের সে যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা’ (JCPOA)--এর খুব কাছাকাছি, যা থেকে ২০১৮ সালে ট্রাম্প নিজেই অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন ও স্টিমসন সেন্টারের মতো আন্তর্জাতিক থিংক-ট্যাংকগুলোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার খরচ এবং একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ বাঁধানোর পর আমেরিকা ঘুরেফিরে সে একই জায়গায় এসে উপনীত হলো, যেখানে তারা যুদ্ধের আগে ছিল। এটি কোনো দূরদর্শী স্ট্র্যাটেজির অংশ নয়; বরং হেগেলের ভাষা ধার করে বলতে গেলে, এটি যুক্তির কৌশল নয়, বরং অবিবেচনাপ্রসূত দ্বিধা ও বোকামির আরেকটি দৃষ্টান্ত।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম যেমন দ্য উইক বা এসবিএন নিউজ-এর বিশ্লেষণে এটি স্পষ্ট যে, এই যুদ্ধে কৌশলগতভাবে লাভবান হয়েছে ইরান। তারা তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রোগ্রাম ও আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্কগুলোকে সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন রেখেই বড় ধরণের মার্কিন অবরোধ মওকুফ এবং ২৪ বিলিয়ন ডলারের তহবিল মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, সবচেয়ে বড় কৌশলগত পরাজয় ঘটেছে ইসরাইলের, যারা মার্কিন কাঁধে বন্দুক রেখে ইরানকে চিরতরে পঙ্গু করতে চেয়েছিল, কিন্তু দিনশেষে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে তারা আজ আরও বেশি একাকী ও কোণঠাসা।

ভিয়েতনামের সায়গন থেকে শুরু করে আফগানিস্তানের কাবুল, আর সর্বশেষ ২০২৬ সালের পারস্য উপসাগর- আমেরিকার প্রতিটি সামরিক অভিযানের পরিণতি ওয়াশিংটনের জন্য একই বার্তা বহন করে এনেছে। শক্তির মদমত্ততায় ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে অবমূল্যায়ন করে কোনো সার্বভৌম দেশের ওপর জোরপূর্বক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার দিন যে ফুরিয়ে এসেছে, এ চুক্তি তারই এক আনুষ্ঠানিক দলিল। প্রায় পাঁচ দশকের মুখোমুখি অবস্থানের পর ওয়াশিংটন আজ অবলীলায় সেই সত্যটিই স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের গতিপথ অনেক আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছিল- বিশ্বমঞ্চে একক মোড়লগিরি বা উত্তর-আমেরিকাকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার একচ্ছত্র আধিপত্যের যুগ এখন সমাপ্তির পথে। পারস্য উপসাগরে আজ যে নতুন শক্তির ভারসাম্য তৈরি হলো, তা কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি নয়, বরং তা এক বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার উদীয়মান সূর্যকে স্বাগত জানানোর এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। লেখক: সাংবাদিক।