মুন্সী আবু আহনাফ
বাংলাদেশ রাষ্ট্র এখন এক চরম ঐতিহাসিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের হোতা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিচার এবং দল হিসেবে সেটিকে নিষিদ্ধ করার দাবিটি জনপরিসরে বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে। একটি দল যখন রাষ্ট্রযন্ত্রকে অপব্যবহার করে গণহত্যামূলক দমনপীড়ন চালায়, গুম-খুন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি তৈরি করে, আয়নাঘর তৈরি করে মানুষের জীবনকে শেষ করে দেয়, বাক-স্বাধীনতা, ভোটের অধিকার, মানবাধিকার কেড়ে নেয়, তখন সেই দলের আইনি ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে; তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক থাকাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, আমাদের দেশের মূলধারার সাংবাদিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় তথ্য যাচাইয়ের (Fact-check) এক চরম উদাসীনতা ও দুর্বলতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশে সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হলো, বিশেষজ্ঞ হিসেবে যাদের অভিমত বা বক্তব্য নেওয়া হয়, তা বিন্দুমাত্র যাচাই ছাড়াই প্রকাশ করা হয়। এক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমগুলোর পক্ষ থেকে এক অদ্ভুত যুক্তি দেওয়া হয় ‘আমাদের কী? যিনি বলেছেন, ভুল হলে দায় তাঁর।’দেশের টেলিভিশন টকশো বা সংবাদমাধ্যমে এই ব্যাধির যেন এক মহামারী চলছে। সম্প্রতি দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকে প্রখ্যাত ও শ্রদ্ধেয় আইনজীবী শাহদীন মালিকের একটি অভিমত ছাপা হয়। সেখানে তিনি বলেন, “এ পর্যন্ত শুধু শুনেই আসছি আওয়ামী লীগের বিচার করা হবে। অথচ কোন আইনে, কোন অপরাধে বিচার হবে সেটি স্পষ্ট করে কারও মুখে শুনিনি। নিয়মিত আইনে বিচার হবে, নাকি বিশেষ আইনে হবে সেটিও জানি না। পৃথিবীতে কোনো দলকে বিচারের মুখোমুখি করা ও আদালতের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করার নজির আমার জানা নেই।”
একজন জ্যেষ্ঠ ও বিজ্ঞ আইনজীবীর মুখ থেকে যখন বলা হয় “পৃথিবীতে কোনো দলকে আদালতের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করার নজির জানা নেই”, তখন সাধারণ পাঠকের মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, গণতান্ত্রিক বিশ্বে এমন ঘটনা আসলেই অলীক। যেহেতু শাহদীন মালিক বলেছেন ‘উনার জানা নেই’ তাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার নিয়ম অনুযায়ী বক্তব্যটির সত্যতা চেক করা উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে তা হুবহু ছাপানো হয়েছে। পরে এই ভুল বক্তব্যটিকে কপি করে দেশের বেশ কিছু প্রোপাগান্ডা ও ক্লিকবেইট ওয়েবসাইট নিউজ প্রকাশ করে বসে “রাজনৈতিক দলকে বিচারের মুখোমুখি ও আদালতের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করার নজির পৃথিবীতে নেই।” অথচ আধুনিক পৃথিবীর রাজনৈতিক ও আইনি ইতিহাস একটু ওলটপালট করলেই জানা যায়, পৃথিবীতে রাজনৈতিক দলকে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করার শত শত নজির রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাৎসি বা ফ্যাসিস্টদের নিষিদ্ধ করার উদাহরণ দিয়ে আমরা দূর অতীতে যেতে চাই না। এমনকি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত আদালত কিংবা স্বৈরাচারী শাসকের সময়কার আদালতের নজিরও আমরা দেব না, কারণ সেগুলোতে প্রতিপক্ষকে দমনের উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দল নিষিদ্ধ করার অভিযোগ থাকে। তাই যেসব দেশে স্বৈরতান্ত্রিক বা কর্তৃত্ববাদী শাসন ছিল বা আছে, সেগুলোর উদাহরণ আমরা বাদ দিচ্ছি। সে কারণে তুরস্ক, মিশর, থাইল্যান্ডের মতো দেশের ঘটনাগুলো একপাশে সরিয়ে রেখে আসুন, আধুনিককালে উদার ও উন্নত গণতন্ত্র চালুর পর স্বাধীন বিচার বিভাগের মাধ্যমে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণের কিছু চাক্ষুস বৈশ্বিক উদাহরণ দেখে নেওয়া যাক।
এক. ইউরোপের অন্যতম প্রধান গণতান্ত্রিক দেশ স্পেন। ২০০২ সালে স্পেনে একটি নতুন ‘political party law' বা রাজনৈতিক দল আইন পাস করা হয়। এই আইনের অধীনে, ২০০৩ সালের মার্চ মাসে স্পেনের সুপ্রিম Court (Tribunal Supreme) সর্বসম্মতভাবে ‘বাতাসুনা’ (Batasuna) নামক রাজনৈতিক দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। দলটির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল, তারা সশস্ত্র ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ‘ইটিএ’ (ETA)-র রাজনৈতিক শাখা হিসেবে কাজ করছিল এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নিন্দা করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। আন্তর্জাতিক আদালতেও রাজনৈতিক দল ‘বাতাসুনা’ নিষিদ্ধের এই রায়কে স্বীকৃতি দেয়। বাতাসুনা এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত (European Court of Human Rights - ECHR)-এ আপিল করে। ২০০৯ সালের জুন মাসে ইসিএইচআর (ECHR) স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের রায় বহাল রাখে এবং সর্বসম্মতভাবে রায় দেয় যে, একটি গণতান্ত্রিক সমাজকে রক্ষা করার জন্য সন্ত্রাসবাদকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থনকারী রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা সম্পূর্ণ বৈধ এবং এটি মানবাধিকারের লঙ্ঘন নয়।
দুই. ইউরোপের প্রাণকেন্দ্র এবং অত্যন্ত উদারপন্থী দেশ হিসেবে পরিচিত বেলজিয়াম। ২০০৪ সালের নভেম্বর মাসে বেলজিয়ামের সর্বোচ্চ আপিল আদালত (Court of Cassation) দেশটির অন্যতম প্রধান ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ভøামস ব্লক Vlaams Block)-কে কার্যত নিষিদ্ধ ও বিলুপ্ত ঘোষণা করে। দলটির বিরুদ্ধে বেলজিয়ামের ‘বর্ণবাদ ও বিদেশী-বিদ্বেষ বিরোধী আইন’ লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। আদালত রায় দেয় যে, এই দলটি পদ্ধতিগতভাবে জাতিগত বৈষম্য ও সমাজ ভাঙার ঘৃণা ছড়াচ্ছিল। আদালতের এই রায়ের পর দলটির তহবিল ও আইনি অস্তিত্ব বন্ধ হয়ে যায়। দলটির সব সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয়। পরবর্তীতে তারা নাম বদলে ‘ভøামস বেলাং’ নামে নতুন দল গঠন করতে বাধ্য হয়।
তিন. জার্মানির ফেডারেল কনস্টিটিউশনাল কোর্ট (Bundesverfassungsgericht) দেশটির গণতন্ত্র রক্ষার্থে অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে। জার্মানির মৌলিক আইনের (Grundgesetz) অনুচ্ছেদ ২১ (২) অনুযায়ী, কোনো দল যদি মুক্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে চায়, তবে তাকে নিষিদ্ধ করার এখতিয়ার আদালতের রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫২ সালে জার্মানির সর্বোচ্চ আদালত নব্য-নাৎসি (Neo-Nazi) ভাবাদর্শের রাজনৈতিক দল ‘সোশ্যালিস্ট রাইখ পার্টি’কে নিষিদ্ধ করে। একই আদালত ১৯৫৬ সালে জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, কারণ তাদের উদ্দেশ্য ছিল দেশের গণতান্ত্রিক শাসনকাঠামোকে উল্টে দেওয়া।
চার. খুব বেশি দূর অতীতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে গ্রিসের একটি উচ্চ আদালত দেশটির অতি-ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ‘গোল্ডেন ডন’ (Golden Dawn)-কে একটি ‘ক্রিমিনাল অর্গানাইজেশন’ বা অপরাধী সংগঠন হিসেবে রায় দেয়। দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব ও সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী খুন, অভিবাসীদের ওপর সহিংস আক্রমণ এবং রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধমূলক চক্র পরিচালনার অভিযোগ প্রমাণিত হয়। আদালতের রায়ের পর দলটির প্রধান নিকোস মিচালোলিয়াকোসসহ শীর্ষ নেতাদের দীর্ঘ মেয়াদে জেল দেওয়া হয় এবং দলটির রাজনৈতিক অস্তিত্ব গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
পাঁচ. এশিয়ার অন্যতম সফল ও সভ্য গণতন্ত্রের দেশ দক্ষিণ কোরিয়া। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার সাংবিধানিক আদালত (Constitutional Court) দেশটির বামপন্থী রাজনৈতিক দল ‘ইউনিফাইড প্রোগ্রেসিভ পার্টি’ (UPP)-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। আদালতের ৯ জন বিচারকের মধ্যে ৮ জনই দলটিকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে রায় দেন। দলটির বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তারা উত্তর কোরিয়ার স্বৈরাচারী আদর্শ ধারণ করে দক্ষিণ কোরিয়ার গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে উৎখাত করার জন্য অন্তর্ঘাতমূলক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। আদালত দলটির নিবন্ধন বাতিলের পাশাপাশি তাদের সংসদীয় আসনগুলোও শূন্য ঘোষণা করে।
ছয়. ইউক্রেন নিজেদের পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়ায় আইনি প্রক্রিয়ায় দল নিষিদ্ধ করেছে। ২০১৫ সালে আদালতের মাধ্যমে ইউক্রেনের কমিউনিস্ট পার্টি-কে নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন শুরুর পর ইউক্রেনের আপিল আদালত দেশটির বৃহত্তম বিরোধী দল ‘অপজিশন প্ল্যাটফর্ম ফর লাইফ’ সহ প্রায় এক ডজন রুশপন্থী রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে, কারণ নিজ দেশ রেখে প্রতিবেশী ও শত্রুরাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে প্রেম-প্রেম ভাবের কারণে তারা সার্বভৌম দেশের ভেতর থেকে গুপ্তচরবৃত্তি ও প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছিল।
সাত. স্বৈরশাসনের নারকীয় গণহত্যার পর কম্বোডিয়া যখন গণতন্ত্রের পথে হাঁটা শুরু করে, তখন তারা তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অপরাধী দল স্বৈরাচারী কমিউনিস্ট সরকারের খেমার রুজ পার্টিকে প্রথমে আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এবং পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে সংসদে সর্বদলীয় সম্মতিতে আইন করে চিরতরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
আট. অস্ট্রেলিয়ার মতো একটি প্রথম সারির কমনওয়েলথ গণতান্ত্রিক দেশে ১৯৫১ সালে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। তৎকালীন সরকার আইন করে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিল। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ আদালত (High Court of Australia) সরকারের সেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে বাতিল করে দেয় এবং রায় দেয় যে, ঢালাওভাবে নির্বাহী আদেশে বা সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতায় কোনো দলকে নিষিদ্ধ করা যাবে না। যদি কোনো দলকে নিষিদ্ধ করতেই হয়, তবে তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধ বা সহিংসতার প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করতে হবে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের একক এখতিয়ার কেবল স্বাধীন বিচার বিভাগের, সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নয়।
নয়. বহুদলীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোর দেশ ইসরাইলে ১৯৯৪ সালে একটি কট্টরপন্থী রাজনৈতিক দলকে আদালতের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করা হয়। অতি-ডানপন্থী এবং চরম বর্ণবাদী দল ‘কাখ’ ( Kach)-এর বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনী ও আরব নাগরিকদের ওপর সহিংসতা ও জাতিগত বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দেশটির সর্বোচ্চ আদালত (Supreme Court) দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ চিরতরে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
দশ. পূর্ব ইউরোপের উদীয়মান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মলদোভায় অতি সম্প্রতি ২০২৩ সালের জুন মাসে দেশের সাংবিধানিক আদালত একটি প্রধান বিরোধী দলকে নিষিদ্ধ করেছে। ব্যবসায়ী ইলান শোরের নেতৃত্বাধীন ‘শোর পার্টি’ (Shor Party)-র বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তারা রাশিয়ার কাছ থেকে অবৈধ অর্থায়ন (Illegal
Funding) নিয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করতে এবং গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করতে সহিংস বিক্ষোভের উসকানি দিচ্ছিল। মলদোভার সাংবিধানিক আদালত দলটিকে ‘অসাংবিধানিক’ ঘোষণা করে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে দেয়।
এগারো. গত ১৭ বছরের শাসন আমলে সংঘটিত গুম, খুন, আয়নাঘর, শাপলা চত্বরের নৃশংসতা, বিডিআর বিদ্রোহের নেপথ্যের ঘটনা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও আলেমদের ওপর জুলুম এবং চব্বিশের জুলাই গণহত্যা, এই সবকিছুর দায় সামগ্রিক সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের কারণে রাজনৈতিক দল হিসেবে সরাসরি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ওপর বর্তায়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, যখন কোনো রাজনৈতিক দল নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি ছেড়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত হয়, তখন তার বিচার ব্যক্তি ও সংগঠন উভয় স্তরেই সম্ভব। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনি কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) আইনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের এই বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব। ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের (International Crimes (Tribunals) Act, ১৯৭৩) ৩(১) এবং ২০(২) ধারা অনুযায়ী, কেবল ব্যক্তি নয়, যেকোনো ‘সংগঠন’ বা ‘দল’ যদি গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ কিংবা যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত হয়, তবে সেই সংগঠনকে বিচারের মুখোমুখি করার স্পষ্ট বিধান রয়েছে। ট্রাইব্যুনালে অপরাধ প্রমাণিত হলে, উক্ত আইনের আওতায় আদালত কোনো দলকে নিষিদ্ধ বা বিলুপ্ত ঘোষণা করার জন্য সরকারের প্রতি সুনির্দিষ্ট আইনি সুপারিশ করতে পারে। এছাড়া, বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৮ (সংগঠন করার স্বাধীনতা) অনুযায়ী, কোনো দল যদি দেশের সার্বভৌমত্ব, জনশৃঙ্খলা কিংবা মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী এবং সন্ত্রাসী কার্যকলাপে লিপ্ত হয়, তবে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক অধিকার বাতিল ও নিষিদ্ধ করা সম্পূর্ণ বৈধ। অতএব, ট্রাইব্যুনালের অধীনে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রসিকিউশন যদি আওয়ামী লীগের প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংগঠনিক অপরাধের খতিয়ান তুলে ধরে, তবে সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ায় এবং আদালতের রায়ের মাধ্যমেই দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ও বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব।
পরিশেষে : এখন স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসে আমাদের মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবীদের দায়বদ্ধতা কোথায়? উপরের এই আন্তর্জাতিক খতিয়ান ও সুনির্দিষ্ট রেফারেন্সগুলো প্রমাণ করে যে, “পৃথিবীতে কোনো দলকে আদালতের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করার নজির নেই” এই বহুল প্রচারিত দাবিটি তথ্যগতভাবে সম্পূর্ণ ভুল, ভিত্তিহীন এবং বিভ্রান্তিকর। শাহদীন মালিকের মতো একজন সম্মানিত আইনজ্ঞ যখন বলেন “আমার জানা নেই”, তখন সেটি উনার ব্যক্তিগত জানাশোনার সীমাবদ্ধতা হতে পারে। একজন মানুষের পক্ষে পৃথিবীর সব দেশের সব আইন জানা সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের কাজ হলো সেই সীমাবদ্ধতাকে দূর করে সঠিক তথ্যটি ফ্যাক্ট-চেক বা যাচাইয়ের মাধ্যমে পাঠকের সামনে তুলে ধরা। তা না করে যখন কোনো যাচাই ছাড়া এই ভুল বক্তব্য প্রকাশ করা হয় এবং তা নিয়ে প্রোপাগান্ডা চালানো হয়, তখন তা জনমনে চরম বিভ্রান্তি তৈরি করে।
আওয়ামী লীগের শাসন আমলে সংঘটিত অপরাধগুলোর বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) বা বিশেষ কোনো সাংবিধানিক আদালতের মাধ্যমে হতেই পারে। বিশ্বের বহু দেশেই গণহত্যাকারী বা মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত দলকে আইনি প্রক্রিয়ায় নিষিদ্ধ করার স্পষ্ট আইনি কাঠামো ও নজির রয়েছে। তাই আমাদের বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, কেবল ‘যিনি বলেছেন তাঁর দায়’ এই খোঁড়া যুক্তি দিয়ে পার পাওয়ার অপসংস্কৃতি বন্ধ করুন। বাংলাদেশের পাঠক এখন অনেক সচেতন। আন্তর্জাতিক দুনিয়ার আইন ও ইতিহাস এখন সবার হাতের মুঠোয়। জনমনে বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে, সঠিক তথ্য ও আন্তর্জাতিক আইনি নজিরের আলোকে আমাদের দেশের আইনি সংকটগুলোর সমাধান খোঁজাটাই হবে প্রকৃত দায়িত্বশীলতা।