মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম , ফ্রান্স থেকে

ফ্রান্সের ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশটির কট্টর ডানপন্থী দল রাসঁব্লমঁ নাসিওনাল (আরএন)-এর অন্যতম আলোচিত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি; জনসমক্ষে হিজাব নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা—নিয়ে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে এ নীতির পক্ষে অবস্থান নেওয়া মারিন ল্য পেন এবারও তাঁর অবস্থান থেকে সরে আসতে রাজি নন। তবে দলের সভাপতি জোরদান বারদেলাসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতা মনে করছেন, এমন নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন আইনগতভাবে কঠিন এবং রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ফলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই এ ইস্যুতে দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

ফরাসি দৈনিক ল্য মোঁদ-এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৫ এপ্রিল প্যারিসের দক্ষিণ-পশ্চিমে এসোন বিভাগের বিয়েভ্র শহরে দুই দিনের একটি গোপন কৌশলগত বৈঠকের আয়োজন করেন মারিন ল্য পেন ও জর্ডান বারদেলা। বৈঠকে আরএনের প্রায় ১৫ জন শীর্ষ নেতা অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের কেবল বৈঠকের স্থান জানানো হলেও আলোচ্যসূচি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গোপন রাখা হয়। অনেকের ধারণা ছিল, এই বৈঠকে দলটির ভবিষ্যৎ কর্মসূচি এবং নতুন রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মূল লক্ষ্য ছিল মারিন ল্য পেন ও জর্ডান বারদেলার ঘনিষ্ঠদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং দলের ঐক্যের বার্তা দেওয়া।

এই বৈঠকের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল মারিন ল্য পেনকে ঘিরে চলমান বিচারিক অনিশ্চয়তা। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সহকারী নিয়োগসংক্রান্ত মামলায় তিনি আইনি চাপে রয়েছেন। সেই প্রেক্ষাপটে দলীয় নেতৃত্বের মধ্যে কোনো বিভক্তির বার্তা বাইরে না যাওয়া নিশ্চিত করাই ছিল বৈঠকের অন্যতম উদ্দেশ্য। যদিও প্রকাশ্যে মতবিরোধ এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, তবুও হিজাব নিষিদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভিন্নমত সামনে চলে আসে।

মারিন ল্য পেন ২০১২ সাল থেকেই জনসমক্ষে ইসলামি হিজাব নিষিদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন। তাঁর মতে, এটি ফ্রান্সের ধর্মনিরপেক্ষতা (লাসিতে) রক্ষা, রাজনৈতিক ইসলামবাদের বিস্তার রোধ এবং জাতীয় পরিচয় সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয়। তিনি বরাবরই দাবি করে আসছেন, ধর্মীয় প্রতীক জনপরিসরে সীমিত করা হলে ফরাসি প্রজাতন্ত্রের মূল্যবোধ আরও শক্তিশালী হবে।

কিন্তু দলের সভাপতি জর্ডান বারদেলা এ নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, জনসমক্ষে হিজাব নিষিদ্ধ করতে গেলে তা আইনগত ও সাংবিধানিক জটিলতার মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করাও প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে। দলের আরও কয়েকজন নেতা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এ ধরনের বিতর্কিত প্রতিশ্রুতি মধ্যপন্থী ভোটারদের একটি অংশকে আরএনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বাধ্য করতে পারে। ফলে নির্বাচনী কৌশলের দিক থেকেও বিষয়টি নতুন করে ভাবা প্রয়োজন।

তবে এসব আপত্তি সত্ত্বেও মারিন ল্য পেন তাঁর অবস্থান পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত দেননি। বরং তিনি এ বিষয়টিকে জনগণের সরাসরি সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। প্রয়োজনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হলে হিজাব নিষিদ্ধের প্রশ্নে জাতীয় গণভোট আয়োজনের কথাও তিনি বিবেচনা করছেন। তাঁর ঘনিষ্ঠদের মতে, এত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও সাংবিধানিক প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণের কাছ থেকেই আসা উচিত।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্ক শুধু হিজাব নিষিদ্ধ করার নীতি নিয়ে নয়; বরং আরএনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও। একদিকে মারিন ল্য পেন তাঁর ঐতিহ্যগত কট্টর অবস্থান ধরে রাখতে চান, অন্যদিকে জর্ডান বারদেলা দলটিকে আরও গ্রহণযোগ্য ও মধ্যপন্থী ভোটারদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে আগ্রহী। ফলে আগামী নির্বাচনের আগে এই দুই কৌশলের মধ্যে সমন্বয় করাই আরএনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, অভিবাসন, ধর্মনিরপেক্ষতা, নিরাপত্তা এবং জাতীয় পরিচয়ের মতো ইস্যুগুলো তত বেশি গুরুত্ব পাবে। সেই প্রেক্ষাপটে হিজাব নিষিদ্ধের প্রশ্নে আরএনের অভ্যন্তরীণ মতভেদ শুধু দলটির নির্বাচনী কৌশল নয়, ফরাসি রাজনীতির সামগ্রিক গতিপ্রকৃতিতেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।

ছবির ক‍্যাপশান:

২০২৬ সালের ৮ জুলাই সার্ত বিভাগের লা ফ্লেশ শহরের একটি বাজারে, মারিন ল্য পেনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার পরদিন এবং তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার পর, তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন জোরদান বারদেলা।