শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, “জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় কর্মহীন, অবসরপ্রাপ্ত ও বয়স্ক শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করা না হলে বাংলাদেশে একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

বুধবার বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন আয়োজিত ‍‍''শ্রমজীবী মানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তবতা” শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ মন্তব্য করেন।

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমি মনে করি, এ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব না দিলে শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা যাবে না।

তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারীদের পে-স্কেল নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও পরিকল্পনা দেখা যায়। কিন্তু সরকারি ব্যবস্থার বাইরে যে বিশাল শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী রয়েছে, তাদের জীবনমান, মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে সেই তুলনায় খুব কম আলোচনা হয়। এ বৈষম্য দূর করতে হবে।

তিনি বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, ‘তাদের বাজেট ভাবনায় দেশের সামগ্রিক বাস্তবতা এবং শ্রমজীবী মানুষের প্রয়োজনের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। দেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে তারা যে প্রস্তাবনা দিয়েছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী।’

সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, আগামী দিনের চ্যালেঞ্জগুলো বিবেচনায় না এনে যে বাজেট প্রণয়ন করা হবে, তা দেশের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করবে। উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের পথে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জগুলোও স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘শ্রম সংস্কার কমিশনের কাছে আমরা যেসব বিষয় উত্থাপন করেছি, সেগুলোর অনেকাংশই বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের বাজেট ভাবনায় অত্যন্ত সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।’

শ্রমিকদের মজুরি সুরক্ষার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘একজন উদ্যোক্তা ব্যবসা পরিচালনার জন্য বাড়ি ভাড়া করেন, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল ক্রয় করেন এবং অন্যান্য ব্যয় অগ্রিম পরিশোধ করেন। কিন্তু শ্রমিকের শ্রম গ্রহণের পর মাস শেষে মজুরি প্রদান করা হয়। এ বাস্তবতা বিবেচনায় আমরা শ্রমিকের মজুরি সুরক্ষার জন্য অন্তত তিন মাসের সমপরিমাণ মজুরি অগ্রিম সংরক্ষণের প্রস্তাব করেছি। এর মাধ্যমে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও আয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’

তিনি শ্রমিকবান্ধব রাষ্ট্র গঠনে ন্যায্য মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং শ্রমিক সুরক্ষামূলক নীতিমালা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

আলোচনা সভায় বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান সভাপতির বক্তব্যে বলেন, “আমরা দেখলাম শ্রম সংস্কার কমিশন নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের কাছে গেছে, তাদের বক্তব্য গ্রহণ করেছে এবং প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে শ্রমিক অধিকারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কাজ করেছে। এর ফলে প্রায় সব রাজনৈতিক দলই তাদের ইশতেহারে শ্রমিক অধিকারের বিষয়টি স্থান দিয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন গত ১৮ মে জাতীয় প্রেসক্লাবে শ্রমিকদের বাজেট ভাবনা নিয়ে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল। পরবর্তীতে ২৪ মে একই স্থানে আমরা শ্রমিকবান্ধব বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপন করি। আমাদের সেই প্রস্তাবনাগুলো বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে এবং অনেক পত্রিকা এ বিষয়ে ক্রোড়পত্রও প্রকাশ করেছে।

অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, আমরা সরকারকে প্রায় ৩০টি সুপারিশ দিয়েছিলাম, যাতে শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এর মধ্যে শ্রমিকদের ডিজিটাল ডাটাবেজ প্রণয়ন, নারী শ্রমিকদের জন্য বাস সার্ভিস চালু এবং ১৫ লাখ জেলে পরিবারকে ভিজিএফ সুবিধার আওতায় আনার বিষয়গুলো বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া সামাজিক অবকাঠামো ও নিরাপত্তা খাতে ১ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও বলা হয়েছে।

তবে এর বাইরে শ্রমিকদের ভাগ্য পরিবর্তন, বৈষম্য দূরীকরণ এবং তাদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বাজেটে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

বিগত ১০ বছরের বাজেট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শ্রমিক খাতে বরাদ্দের ক্ষেত্রে এবারের বাজেট তুলনামূলকভাবে আরও পিছিয়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ নতুন শ্রমিক শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে। সেই হিসেবে গত ১০ বছরে প্রায় ২ কোটি শ্রমিক যুক্ত হয়েছে। অথচ ১০ বছর আগে শ্রমিক খাতে বরাদ্দ ছিল মোট বাজেটের ০.০০৬ শতাংশ, যা বর্তমানে কমে ০.০০৪ শতাংশে নেমে এসেছে। আমরা যে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের প্রত্যাশা করি, এই বাজেট কোনোভাবেই সেই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে না।

তিনি আরও বলেন, এ বাজেট বাংলাদেশের শ্রমিকদের বাস্তবতা ও প্রয়োজনকে সামনে রেখে প্রণয়ন করা হয়নি। যারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে বাজেট প্রণয়ন করেন, সেখানে কোনো শ্রমিক প্রতিনিধির অংশগ্রহণ থাকে না। ফলে এটি শ্রমিকবান্ধব নয়, বরং একটি এলিটবান্ধব বাজেটে পরিণত হয়েছে।

তিনি সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের উদ্দেশে বলেন, শ্রমিকদের ভোটে আপনারা এমপি হয়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন। তাই শ্রমিকদের পক্ষে আপনাদের সোচ্চার হতে হবে। যদি শ্রমিকদের পক্ষে কথা না বলেন, তাহলে আমরা বলতে বাধ্য হব—আপনারা শ্রমিকবান্ধব জনপ্রতিনিধি হতে পারেননি।

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা আশা করি সরকার আমাদের যৌক্তিক দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। আমরা জাতীয় বাজেটে শ্রমিক খাতে অন্তত ১০ শতাংশ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছিলাম। পাশাপাশি মজুরি সুরক্ষা তহবিল গঠন, পেশাভিত্তিক বীমা চালু এবং শ্রমিকদের জন্য কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রস্তাবও দিয়েছিলাম। কিন্তু এসব দাবির প্রতিফলন এবারের বাজেটে আমরা দেখতে পাইনি।”

আমরা বলেছিলাম পরোক্ষ কর দেবেন না কিন্তু এ কথা সরকার রাখলেন না পরোক্ষ করের মাধ্যমে গরিব মারার বাজেট তৈরি হয়েছে।

আমরা আশা করব সময় আছে তার মধ্যে শ্রমিকের জন্য রেশনের ব্যবস্থা মহার্ঘ্য ভাতার ব্যবস্থা, পরোক্ষ কর কমিয়ে দেওয়া, শ্রমিকদের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প, মজুরি সুরক্ষা তহবিল, স্বাস্থ্য বীমা, ঝুঁকি ভাতা,এবং পেশাগত বীমা সহ সব মিলিয়ে আমরা দেখতে চাই বর্তমান সরকার কথায় নয় কাজে বিশ্বাসী।

সভা পরিচালনা করবেন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লসকর মো. তসলিম,

বিশেষ অতিথি হিবেবে উপস্থিত ছিলেন,

কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ রিক্সা-ভ্যান শ্রমিক ঐক্য পরিষদ সভাপতি

অধ্যাপক হারুনুর রশিদ, শ্রম সংস্কার কমিশন সদস্য এ এম ফয়েজ আহমদ,

লেবার ফেডারেশনের সাধারন সম্পাদক সাকিল আখতার চৌধুরী,

কৃষিজীবি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি গোলাম রব্বানী,

পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন সভাপতি কবির আহমদ,

দর্জি শ্রমিক ফেডারেশন সভাপতি এডভোকেট আলমগীর হোসেন,

হোটেল ও হাসপাতাল শ্রমিক ইউনিয়ন সভাপতি আব্দুস সালাম,

রিক্সা ভ্যান শ্রমিকঐক ফেডারেশন সাধারন সম্পাদক মাওলানা মহিবুল্লাহ,

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মচারি সমিতির সভাপতি আজহারুল ইসলাম,

বাংলাদেশ প্রগতিশীল নির্মান শ্রমিকের সভাপতি নুজরুল আমিন, বাংলাদেশ প্রগতিশীল গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন সভাপতি সোহেল রানা মিঠু,

রেলওয়ে এমপ্লয়িজ লীগের সহ-সভাপতি ওমর ফারুক,

বিটিসিএল আদর্শ শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নুরুল ইসলাম

ডিপিডিসির সভাপতি আ ন ম বজলুর রহমান

ডেসকো আউটসোর্সিং সভাপতি আবুল হোসেন,

নৌযান শ্রমিক নেতা ওসমানগণি, জামিল মাহমুদ, হাফিজুর রহমান প্রমুখ।