বিএনপি নির্বাচনের আগে বিচারের আশ্বাস দিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে সুর পাল্টে ফেলেছে। তাঁরা ফ্যাসিবাদের পথ ধরেই হাঁটছে। বাংলাদেশ বারবার বিপ্লবের সাক্ষী। এদেশের মানুষ বিপ্লবী। জনগণ রাজপথে নামলে কোনো সরকারই টিকতে পারে না। জুলাইয়ের চেতনা বিচার ও সংস্কার উপেক্ষা করে সরকার ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটলে সেই পথ থেকে সরকারকে সোজা পথে আনতে যা যা করণীয়, তাই করা হবে।

আওয়ামী ফ্যাসিস্ট কর্তৃক সংঘটিত সকল গুম, খুন ও গণহত্যার বিচারের দাবিতে আজ মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিকেলে রাজধানীর বিজয়নগর মোড়ে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি এ মন্তব্য করেন।

জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আওয়ামী লীগের দ্বারা যত গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে, তার প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কারো প্রতি কোনো প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করা অন্যায়। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে বিদায়ের পথ বেছে নেওয়ার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

বিরোধীদলীয় নেতা জানান, নির্মূলের ঘোষণা দিয়ে আওয়ামী লীগ নিজেই নির্মূল হয়ে গেছে। তিনি বলেন, নির্মূল-নির্মূল করবেন না। জামায়াতে ইসলামী কারো রক্তচক্ষুকে ভয় পায় না। জামায়াতে ইসলামী এদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আপসহীন ভূমিকা অব্যাহত রাখবে।

১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদের সভাপতিত্বে ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপির পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনিসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাহ হোসেন মিয়াজী, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমীর আহমেদ আলী কাসেমী, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, নেজামে ইসলাম পার্টির নায়েবে আমীর আব্দুল মাজেদ আতহারী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব খন্দকার মিরাজুল ইসলাম, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইকবাল হোসেন প্রমুখ।

সমাবেশে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এমপি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো একটি হত্যাকাণ্ডের বিচারও সম্পন্ন করতে না পারা আমাদের জন্য চরম উদ্বেগের। এজন্য চিফ প্রসিকিউটরকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিচার বিলম্বিত হওয়ার পেছনে চিফ প্রসিকিউটর দায়ী।

এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, আওয়ামী লীগ আগাগোড়ায় ভারতীয় পার্টি। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দল নয়। আওয়ামী লীগের বিচার নিশ্চিত না হলে এই সরকার ৫ বছর সম্পন্ন করতে পারবে না।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর আল্লামা মামুনুল হক বলেন, জুলাই বিপ্লবের চেতনা ছিল বৈষম্যহীন এক নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা। নতুন বাংলাদেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদের আবির্ভাব হবে না। জীবন দিয়ে হলেও সেই আকাঙ্খা বাস্তবায়নে কাজ করার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করা হবে। যদি বিএনপি সরকার আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিচার করতে না পারে তবে বিএনপিকে জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। তিনি আরও বলেন, যেই ফ্যাসিবাদ বিদায় হয়েছে সেই ফ্যাসিবাদকে নতুনরূপে কিংবা পুরোনো রূপে আর ফিরতে দেওয়া হবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, জুলাই উপেক্ষা করে পার পাওয়া যাবে না।

এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কেন হয়েছে বিএনপি সেটি ভুলে গেছে। তিনি গণ-অভ্যুত্থান কেন হয়েছে স্মরণ করে দিয়ে বলেন, ক্ষমতার অহমিকা আর দাম্ভিকতায় আজ ভুলে গেলেও কাল ঠিকই আবার মনে পড়বে। তিনি বলেন, বিচার করতে যদি ভয় লাগে তবে ক্ষমতা গ্রহণ করলেন কেন? তিনি জুলাই জাদুঘর উন্মুক্ত করার দাবি জানান।

লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজ রহমান ইরান বলেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশে কোথাও রাজনীতি করতে দেয়া হবে না। আওয়ামী লীগ এদেশের জনগণের দুশমন। তিনি আওয়ামী লীগের শাসনামলের প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন।

জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান বলেন, পলাশী যুদ্ধের বেঈমানিকে ধারণ করে ২৩ জুন সন্ত্রাসী সংগঠন আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। তারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ভারতের দালালী করার জন্য আর এদেশের জনগণকে শোষণ করার জন্য।

এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাহ হোসেন মিয়াজী বলেন, আওয়ামী লীগ কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যার বিচার নিশ্চিত না করলে বিএনপি সরকারকে জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর আগেই বিশেষ বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের বিচার করতে সরকারের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।

খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমীর আহমেদ আলী কাসেমী বলেন, বিএনপি সরকারের বাহাত্তরের সংবিধানের জন্য মায়াকান্না হচ্ছে। কিন্তু বাহাত্তরের সংবিধান মানলে ২০২৬ সালে সংসদ নির্বাচন হয় না। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ২০২৯ সালে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কারণে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ পালিয়ে যাওয়ার ফলে নির্বাচনের সুযোগ হয়েছে। যেই জুলাইয়ের কারণে সেই সুযোগ হয়েছে সেই জুলাইকে বিএনপি অস্বীকার করছে।

নেজামে ইসলাম পার্টির নায়েবে আমীর আব্দুল মাজেদ আত-তাহেরী বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এদেশ থেকে ফ্যাসিবাদ পালিয়ে গেছে। এদেশে আর ফ্যাসিবাদকে ফিরিয়ে আনতে দেওয়া হবে না।

সভাপতির বক্তব্যে ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, যেই সরকারের কাছে নিজ দলের নেতাকর্মী নিরাপদ নয়, যেই সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ১০০ দিনে ৯০০ খুনের ঘটনা ঘটে, সেই সরকারের কাছে দেশ ও জাতি নিরাপদ নয়। সেই সরকারের কাছে বিচার দাবি করে বিচার পাওয়া যাবে না। তাই রাজপথেই সমাধান খুঁজে নিতে হবে। এজন্য আমীরে জামায়াতের ঘোষণায় আরেকটি বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নিতে তিনি দেশবাসীকে আহ্বান জানান।

সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য জনাব মোবারক হোসাইন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর এডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ দেলাওয়ার হোসেন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ডা. ফখরুদ্দিন মানিক, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি যথাক্রমে মোহাম্মদ কামাল হোসেন এমপি, ড. আব্দুল মান্নান এবং মুহাম্মদ শামছুর রহমান। এছাড়াও ১১ দলীয় ঐক্যের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগরীর শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।