বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেছেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছরে শ্রমিকের ভাগ্য পরিবর্তনের নামে অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে শ্রমিকের জীবনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। বিভিন্ন সময়ে বহু নেতা শ্রমিকের পক্ষে কথা বলেছেন, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবর্তন হয়েছে নেতাদের ভাগ্যের, শ্রমিকের নয়। তিনি বলেন, শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা ও স্থায়ী কল্যাণ নিশ্চিত করতে হলে ইসলামী শ্রমনীতি প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) সকালে টাঙ্গাইলের আদর্শ সমাজকল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন টাঙ্গাইল জেলা শাখার উদ্যোগে আয়োজিত ‘দায়িত্বশীল সম্মেলন-২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
টাঙ্গাইল জেলা সভাপতি অধ্যাপক শফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে প্রধান আলোচক ছিলেন জেলা শাখার প্রধান উপদেষ্টা আহসান হাবিব মাসুদ।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি কবির আহমাদ। এছাড়া জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়নের দায়িত্বশীলরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, জাতীয় বাজেট প্রণয়নের আগে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন শ্রমিকবান্ধব একাধিক প্রস্তাব দিয়েছিল। এসব প্রস্তাবের মধ্যে শ্রমিকদের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ, শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের স্বল্প ব্যয়ে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি, ন্যায্য মজুরি নির্ধারণের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শ্রমিকদের জন্য সার্বজনীন কল্যাণ তহবিল বোর্ড গঠনের বিষয় ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এবারের বাজেটে শ্রমখাতে গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা শ্রমিকবান্ধব রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি বলেন, শুধু বক্তৃতা বা প্রতিশ্রুতিতে শ্রমিকের ভাগ্য পরিবর্তন হয় না। বাস্তবসম্মত নীতি, কার্যকর উদ্যোগ এবং জবাবদিহিমূলক নেতৃত্বের মাধ্যমেই শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব। অতীতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এক শ্রেণির শ্রমিক নেতা সংগঠনের নামে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও ব্যক্তিস্বার্থের রাজনীতি করেছে। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের পরিবর্তে তারা নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে ব্যস্ত ছিল। দেশের সাধারণ মানুষও এখন সেই বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করেছে।
তিনি আরও বলেন, গত ১৭ বছরে দেশের বহু শ্রমিক সংগঠনের কার্যক্রমের ওপর এক ধরনের একনায়কতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। প্রকৃত ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং শ্রমিকদের সাংবিধানিক, রাজনৈতিক ও ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার সংকুচিত করা হয়েছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজ দেশে একটি নতুন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে মুক্তভাবে কথা বলা এবং সংগঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন দেশের সর্বাধিক ট্রেড ইউনিয়নের সংগঠন। অতীতে নানা বাধা-বিপত্তি ও রাজনৈতিক নিপীড়নের কারণে সংগঠনের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন ছিল। তবুও সংগঠনটি আদর্শভিত্তিক শ্রমিক আন্দোলনের ধারাকে অক্ষুণ্ন রেখেছে। তিনি বলেন, সরকার যেখানে শ্রমিকের সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হবে, সেখানে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের নেতাকর্মীদের জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন প্রচলিত ধারার ট্রেড ইউনিয়ন নয়। এই সংগঠন চাঁদাবাজি করে না, বরং চাঁদাবাজি প্রতিরোধ করে। শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তাদের ন্যায্য অধিকার আদায় এবং কর্মক্ষেত্রে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করাই সংগঠনের মূল লক্ষ্য। ইসলামী মূল্যবোধ ও নৈতিকতার ভিত্তিতে পরিচালিত শ্রমিক আন্দোলনই শ্রমিকের স্থায়ী মুক্তি নিশ্চিত করতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিভিন্ন মতাদর্শের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ, মার্কসবাদ কিংবা লেনিনবাদ—বিভিন্ন মতাদর্শ বিশ্বের নানা দেশে প্রতিষ্ঠিত হলেও শ্রমিকের প্রকৃত অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারেনি। বরং বহু ক্ষেত্রে শ্রমিকদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ইসলামী শ্রমনীতি শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে ন্যায়বিচার, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ এবং মানবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেয়।
তিনি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হাদিস উদ্ধৃত করে বলেন, “শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি পরিশোধ করো।” এছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) অধীনস্থদের সঙ্গে সদাচরণ, তাদের খাদ্য ও পোশাকের অধিকার নিশ্চিত করা এবং শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার যে শিক্ষা দিয়েছেন, তা বর্তমান বিশ্বের শ্রমনীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও অনুকরণীয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সম্মেলনে বক্তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধারণ করে শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, শ্রম সংস্কার বাস্তবায়ন, সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে আরও শক্তিশালী করা এবং আদর্শভিত্তিক শ্রমিক আন্দোলন বেগবান করার আহ্বান জানান।