খুলনা মহানগরীতে ভারি বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সড়ক ও নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ মানুষ এবং ব্যাহত হয় যান চলাচল। এক কথায় জীবনযাত্রায় হঠাৎ যেন অচলবস্থা নেমে আসে।
খুলনা আবহাওয়া অফিসের সহকারী পরিচালক মিজানুর রহমান জানান, বৃহস্পতিবার দুপুর ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত মোট ৫৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর ভিতরে এক ঘন্টা ছিল মুষলধারায় বৃষ্টি। তিনি আরও বলেন, ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে নগরীতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে পানি ঢুকে চরম ভোগান্তিতে পড়ে নগরবাসী। বিশেষ করে নগরীর রয়্যাল মোড়, বাইতিপাড়া, কেডিএ বাণিজ্যিক এলাকা, ময়লাপোতা, রূপসা ফেরিঘাট, বয়রা বাজার, বাগমারা, মিস্ত্রী পাড়া, টুটপাড়া, বসুপাড়া, মুজগুন্নী সড়ক, ইউসুফ আহমেদ রোড, নতুন রাস্তা মোড়, বাস্তুহারা কলোনিসহ অধিকাংশ এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে যায়। সড়কে পানি জমে থাকায় যানবাহন চলাচল ধীর হয়ে পড়ে। অনেক মোটরসাইকেল, ইজিবাইক ও ব্যক্তিগত যানবাহন পানিতে আটকে বিকল হয়ে যায়। রয়্যাল মোড় এলাকায় পানি জমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েন পথচারীরা। অফিস শেষে বাসায় ফেরার পথে ভোগান্তির শিকার হওয়া নগরীর বাসিন্দা পথচারী আলমগীর হোসেন বলেন, ‘মাত্র এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে গেছে। কোথাও ম্যানহোল বা গর্ত আছে কি না বোঝার উপায় নেই। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।’
পিটিআই মোড় এলাকায় ইজিবাইক নিয়ে আটকে পড়েন চালক মহসিন আলী। তিনি বলেন, ‘বৃষ্টির পানি এত বেশি ছিল যে ইজিবাইকের মোটরে পানি ঢুকে যায়। যাত্রী নামিয়ে দিয়ে অনেক কষ্টে গাড়ি ঠেলে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতে হয়েছে। আজকের রোজগার তো গেলই, উল্টো মেরামতের খরচও গুণতে হবে।’
হঠাৎ ভারী বর্ষণে কর্মস্থল থেকে ফেরত যাত্রী, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ পথচারীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন। অনেককে পানির মধ্যে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাতে দেখা গেছে। সড়কে জমে থাকা পানির কারণে বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ যানজটেরও সৃষ্টি হয়। সড়কে পানি জমে থাকায় অনেক দোকানে ক্রেতা কমে যায় এবং নিচু এলাকায় অবস্থিত কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি প্রবেশের ঘটনা ঘটে।
বয়রা বাজার এলাকার ব্যবসায়ী মো. আজিবর রহমান বলেন, ‘বৃষ্টি শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই দোকানের সামনে পানি জমে যায়। অনেক ক্রেতা ফিরে গেছেন। বিকেলের ব্যস্ত সময়ে ব্যবসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এভাবে বারবার জলাবদ্ধতা হলে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।’
নগরীর গোবরচাকা এলাকার বাসিন্দা নওশের আলীর অভিযোগ, সামান্য বৃষ্টিতেই খুলনার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং অনেক স্থানে ড্রেন ও খাল দখল-দূষণের কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারে না বলে মনে করছেন তিনি।
এদিকে আবহাওয়াবিদ মিজানুর রহমানের মতে, মওসুমী বায়ুর সক্রিয়তার কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে আগামী কয়েকদিনেও খুলনা মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সমন্বয় সংগ্রাম কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ-জামান অভিযোগ করে বলেন, বেশিরভাগ ড্রেনের স্লাব ঠিক নেই। ড্রেনের ভেতর পানি স্থির হয়ে জমে থাকে। বেশিরভাগ ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে আছে। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলে ড্রেনের পানি সরতে চায় না। ময়ুরনদসহ ২২ খাল দখল হয়ে যাওয়ায় শহরের পানি দ্রুত সরতে পারে না। এতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় নগরজুড়ে।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব এডভোকেট মো. বাবুল হাওলাদার বলেন, বিগত দিনে জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে বড় বড় প্রকল্প গ্রহণ হলেও সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে নেই কোনো জবাবদিহি। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবও পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। এজন্য তিনি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণের আহবান জানান।