২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে আন্দোলন। সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে রাস্তায় নেমে এসেছে শিক্ষার্থীরা। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ শহীদ হন আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী। তবু ঘরে আটকে রাখা যাচ্ছে না কাউকে। যাদেরকে আটকে রাখা গেছে, তাঁরা সক্রিয় হন অনলাইনে। যে যেভাবে পারছে, আন্দোলেনে সক্রিয় হচ্ছে। তেমনই একজন নাঈমা সুলতানা। তখন, ২০২৪ সালে তিনি উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ১০ম শ্রেণিতে পড়তেন। শুরুর দিকেই আন্দোলনে যুক্ত হন নাঈমা সুলতানা। নিজের আঁকা ছবি, প্রতিবাদী পোস্টার শেয়ার করা শুরু করেন ফেসবুকে। তবে ঘরে আটকে রেখেও তাঁকে বাঁচাতে পারেনি পরিবার। নিজের বাসার বারান্দায় গুলীবিদ্ধ হয়ে মারা যান। তিনি জুলাই আন্দোলনের প্রথম নারী শহীদ।
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলীতে শহীদ হন আবু সাঈদ। এতে ভীষণ কষ্ট পান নাঈমা। ওইদিন নিজের ফেসবুকে ‘আন্দোলন হবে এবার রং তুলিতে। কোটা প্রথা নিপাত যাক, মেধাবীরা মুক্তি পাক’ ক্যাপশনে শেকল ভাঙার একটি ছবি পোস্ট দেয় সে। নিজের আঁকা প্রতিবাদী পোস্টারের ভাষা, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’, ‘তোমরা কে, রাজাকার’, ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’।
নাঈমার মা আইনুন নাহার বলেন, ‘কোনোভাবেই আটকানো যাচ্ছিল না মেয়েকে। যেকোনো মূল্যে সে যোগ দেবে আন্দোলনে। কিন্তু কি হলো ? ঘরে আটকে রেখেও মেয়েকে বাঁচাতে পারিনি।
আইনুন নাহার বলেন, ‘১৯ জুলাই সারা দিন নাঈমা আমার সঙ্গে বাসায় ছিল। বিকেলের দিকে বারান্দা থেকে কাপড় আনতে যায়। তখন বাসার নিচে আন্দোলন চলছিল। গোলাগুলী হচ্ছিল। ওর পেছন পেছন আমিও বারান্দায় যাই। হঠাৎ দেখলাম বারান্দার রশি থেকে কাপড় নামানোর সময় জানালার গ্রিল ধরে ঢলে পড়ছে। নাঈমার মা বলেন, ‘নাঈমাকে ধরতে গিয়ে দেখি গুলী লেগে মগজ ছিটকে পড়েছে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে, ভেসে যাচ্ছে বারান্দা। আমি কিন্তু গুলীর শব্দ পাইনি। গুলীটা এত গভীরে, মনে হয়েছে স্নাইপারের।’
আইনুন নাহার বলেন, ‘নাঈমাকে যারা গুলী করেছে, আমার কাছে তাঁদের ভিডিও ফুটেজ আছে। সেই ফুটেজ দেখে ১০ থেকে ১২ জনকে শনাক্ত করতে পেরেছি। তাঁদের আসামী করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছি। মামলার চার্জশিট গঠন করা হলেও এখনও বিচার শেষ হয়নি। আমার আর কোনো চাওয়া নেই। মেয়ে হত্যার বিচার দেখে মরতে চাই।’
প্রথম নারী শহীদ হিসেবে নাঈমা সুলতানার নামটি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন শহীদ জননী আইনুন নাহার। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে নাঈমা জুলাই বিপ্লবের প্রথম নারী শহীদ। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই প্রথম নারী শহীদ হিসেবে পাঠ্যপুস্তকে নাঈমা সুলতানার নামটি যেন অন্তর্ভুক্ত করা হয়।’
আইনুন নাহার আরো বলেন, শহীদ নাঈমা সুলতানা ছিল আন্দোলনের অগ্রসেনানী। সে শুধু নিজেই আন্দোলনে যেত না, বন্ধুদেরও উৎসাহিত করত। ছাত্রদের অধিকার আদায়ে এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলনে সে নিয়মিত অংশগ্রহণ করত। তার ছবি আঁকার হাত ছিল অনেক সমৃদ্ধ। ডায়েরিতে আঁকা পোস্টারে লিখেছিল, চেয়েছিলাম অধিকার হয়ে গেলাম রাজাকার, তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন স্লোগান। সে পোস্টারটি ফেসবুক ওয়ালে দিয়ে লিখেছিল- ‘আন্দোলন হবে এবার রংতুলিতে। কোটা প্রথা নিপাত যাক, মেধাবীরা মুক্তি পাক।