পড়াশোনা শেষ করে যে ছেলেটি পরিবারের অভাব দূর করার স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছিল, বুলেট তার সেই স্বপ্নকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া শেখ মো. সাকিব রায়হানের (২২) এই হৃদয়বিদারক গল্পটি কেবল একটি জীবনের অবসান নয়, বরং একটি স্বপ্নবান বুক ঝাঁঝরা করে দেওয়ার এক নির্মম উপাখ্যান।

“বিজয়ের পর আমি ভালো চাকরি নিয়ে বাড়ি ফিরব। আমি তোমাকে সুখী করতে চাই, আব্বা। তোমার আর কাজ করতে হবে না।” খুলনা থেকে ঢাকায় রওনা হওয়ার সময় বাবা আজিজুর রহমানকে পরম শ্রদ্ধায় ও ভালোবাসায় কথাগুলো বলেছিলেন ২২ বছরের তরুণ শেখ মো. সাকিব রায়হান। ঢাকার রূপনগরের বায়তুস সবুজ মাদরাসার প্রাক্তন এই কৃতী ছাত্রের চোখে তখন ছিল এক বুক স্বপ্ন। খুলনায় ভালো সুযোগ না থাকায়, পরিবারের জরাজীর্ণ ঘরের কোণে জমে থাকা অন্ধকার দূর করতে এবং বাবার কাঁধ থেকে সংসারের জোয়াল নামাতে তিনি ঢাকায় গিয়েছিলেন। কিন্তু নিয়তি ছিল অন্যরকম। যে ছেলেটির পহেলা আগস্ট থেকে একটি নতুন চাকরিতে যোগ দেওয়ার কথা ছিল, পরিবারের ভাগ্য বদলানোর কথা ছিলÑ২০২৪ সালের ১৯ জুলাইয়ের এক বিকেলে তার সব স্বপ্ন বুলেটের আঘাতে স্তব্ধ হয়ে গেল।

রাজাকারের খোঁটা এবং একটি প্রতিবাদী মন

সাকিবের বাবা, পেশায় একজন ক্ষুদ্র মুদি দোকানি আজিজুর রহমান চোখ মুছতে মুছতে স্মৃতিচারণ করেন, “যখন শেখ হাসিনা স্বৈরাচারী কায়দায় সাধারণ ছাত্রদের ‘রাজাকারের সন্তান’ বলে আখ্যা দেন, তখনই সাকিবের ভেতরের বিবেক ও আত্মসম্মান জেগে ওঠে। সে আর ঘরে বসে থাকতে পারেনি। বৈষম্যহীন এক নতুন বাংলাদেশের খোঁজে সে ঝাঁপিয়ে পড়ে আন্দোলনে।” জাতীয় অর্থশুমারির মাঠকর্মী এবং রবি আজিয়াটা লিমিটেডের প্রাক্তন এই বিক্রয় প্রতিনিধি পড়াশোনার পাশাপাশি সবসময় সচেষ্ট ছিলেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে। ১২ জুলাই সাকিবের মা-বাবা ঢাকায় গিয়ে তাকে খুলনায় ফিরে আসার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু সাকিব বলেছিলেন, “পহেলা আগস্ট থেকে আমার নতুন চাকরি, আমি এখন যাব না।” বাবা-মা জানতেন না, এটাই ছিল ছেলের সাথে তাদের শেষ দেখা।

একটি ফোন কল এবং পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী লাশ

১৯ জুলাই বিকেল ৪টা। মিরপুর এলাকায় যখন ছাত্র-জনতার আন্দোলন উত্তাল, তখন পুলিশ নির্বিচারে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলী ছোড়ে। স্বৈরাচারবিরোধী স্লোগান দিতে থাকা সাকিব ডান বুকে গুলীবিদ্ধ হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন রাস্তায়। “আপনার ছেলে সাকিব আর নেই।” শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে আসা এই একটি মাত্র ফোন কল মুহূর্তেই ওলটপালট করে দেয় একটি পরিবারের পৃথিবী। সাকিবের বাবা বলেন, “একজন বাবার জন্য তার সন্তানের মৃত্যুর খবরই পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখজনক ও কষ্টদায়ক সংবাদ।” ময়নাতদন্তের রিপোর্টে দেখা যায়, গুলীটি সাকিবের ডান বুক ভেদ করে পিঠের মেরুদন্ড ও কাঁধ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। ২০ জুলাই ফজরের নামায শেষে খুলনা মহানগরীর বসুপাড়া কবরস্থানে যখন ফ্রোজেন গাড়িতে আসা সাকিবের নিথর দেহ দাফন করা হচ্ছিল, তখন যেন এক বাবার কাঁধে পুরো পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বোঝা চেপে বসেছিল।

মায়ের বোবা কান্না ও জরাজীর্ণ ঘরের হাহাকার

খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের নবপল্লী এলাকায় শ্বশুরবাড়ির সামনের একটি ছোট জরাজীর্ণ ঘরে বাস করেন সাকিবের পরিবার। করোনার সময় কাপড়ের ব্যবসা হারিয়ে আজিজুর রহমান আজ নিঃস্ব। সাকিবের মা সাকিবের মৃত্যুর পর থেকে পাথর হয়ে গেছেন। চোখের পানি শুকিয়ে গেছে তার, মুখ ফুটে কাঁদতেও পারছেন না। শুধু বোবা দৃষ্টিতে চেয়ে ভাবছেনÑশেষ মুহূর্তে তার সন্তান কত তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে ছটফট করতে করতে বিদায় নিয়েছে!

প্রতিবেশী কামাল হোসেন জানান, তিন ভাই-বোনের মধ্যে সাকিব ছিলেন সবার ছোট এবং সবার আদরের। সাকিবের বাবা বলেন, “অধিকাংশ সন্তানই হয়তো মায়ের কোলে ফিরে এসেছে, কিন্তু আমার সাকিব আর কোনোদিন ফিরবে না। সে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে, কিন্তু রেখে গেছে তার সেই হাসিমাখা মুখের জ্বলজ্বলে স্মৃতিÑ যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় এক বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের কথা।”

খুনিদের ফাঁসির দাবি

একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকদের ট্যাক্সের টাকায় কেনা বুলেটে কেন একজন সম্ভাবনাময় তরুণের বুক ঝাঁঝরা হবে? এই নির্মম হত্যাকান্ডের বিচার চেয়ে ভেঙে পড়া বাবা আজিজুর রহমান বজ্রকণ্ঠে বিচারের দাবি জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন: “আমি আমার ছেলেকে হত্যার সঙ্গে জড়িত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি মূল নির্দেশদাতা শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং তাদের দোসরদের ফাঁসি চাই। তারা সরাসরি আমার ছেলেকে খুনের সাথে জড়িত। আমি বাংলার মাটিতে আমার সন্তান হত্যার সুষ্ঠু ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।”

সাকিবের বাবার এই আর্তনাদ আজ প্রতিটি সচেতন নাগরিকের। যে স্বপ্ন ও রক্তের বিনিময়ে নতুন বাংলাদেশ অর্জিত হয়েছে, সেই সাকিবের হত্যাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা বা কালক্ষেপণ যেন এই শহীদ পরিবারের বিচার পাওয়ার অধিকারকে কেড়ে না নেয়। সাকিবের রক্তভেজা মাটিতে দাঁড়িয়ে আজ একটাই দাবিÑ হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই!