সবার আগে ভাই হত্যার এবং সব শহীদের খুনিদের বিচার চান শহীদ আব্দুল্লাহ আবীরের বোন মারিয়া ইসলাম মৌরি। সেইসাথে চান জুলাই সনদের বাস্তবায়ন। দৈনিক সংগ্রামের সাথে আলাপকালে তিনি এই দুটি দাবি করেন। জুলাইয়ের দেনা-পাওনা নিয়েও কথা বলেন তিনি। মৌরি বলেন, আমার কাছে মনে হচ্ছে এখন পর্যন্ত জুলাই শহীদদের যে সম্মান পাওয়া উচিত, সেটাই দেওয়া হয়নি। এর অর্থ হলো এখন পর্যন্ত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হয়নি। এরকম কোন কিছ্ ুএখন পর্যন্ত আমরা পাইনি। বর্তমান সরকারের তো জুলাই সনদ দেওয়ার কথা ছিল। আমরা এখন আশাহত। আমরাতো আর কিছু চাই না। আমরা চাই জুলাই শহীদ পরিবারের এবং জুলাই যোদ্ধাদের সম্মান।

মারিয়া ইসলাম মৌরি তার ভাই শহীদ আব্দুল্লাহ আবীরের আন্দোলনে যাওয়ার প্রেক্ষাপট বর্ণনা দিয়ে বলেন, আমার ভাই যে আন্দোলনে গেছে, কোন লোভ-লালসার জন্য যায়নি। আমার ভাইতো দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। ওতো কোটা আন্দোলনের সময় গেছে ১ শে জুলাই। আমার ভাই ছিল আমাদের পরিবারের একমাত্র ছেলে। আর আমার বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে সন্তান। আমার তো বিয়ে হয়ে গেছে। আমার ভাই নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটিতে চাকরি করতো। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পরিবারের খুব করুণ অবস্থা।

এক প্রশ্নের জবাবে মৌরি বলেন, বৈষম্যমুক্ত ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রের জন্য আন্দোলন হয়েছে। অনেকে জীবন দিয়েছে। আমার ভাইও জীবন দিয়েছে। আমার তো মনে হয় না ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র কায়েম হচ্ছে। জুলাইয়ের যে আকাক্সক্ষা ছিল। সেই আকাক্সক্ষা পূরণ হলো না। আমার মনে হয় সমাজ এবং রাষ্ট্রে বৈষম্য রয়ে-ই গেছে।

মারিয়া ইসলাম মৌরি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জুলাই শহীদদের কারণে তো এই সরকার, নতুন সরকার। এতো কিছু। এরপরও কোনরকম পরিবর্তন আমাদের চোখে পড়ছে না। এই যে দুই বছর হয়ে গেল শহীদের হত্যার বিচার হয়নি। আমার ভাইয়ের বিচারের কিছু হলো না। তাহলে কিসের পরিবর্তন আমরা দেখলাম। আমরাতো কোন পরিবর্তন-ই দেখলাম না। তার প্রশ্ন এমনটা কি হওয়ার কথা ছিল ? সেরকম কোন কিছুই হয়নি। মাঝখান দিয়ে আমার ভাইয়ের মতো হাজারো মা সন্তানহারা। বহু পরিবার আছে তারা একমাত্র সন্তান হারিয়েছে। ছোট ছোট বাচ্চা বাবা হারিয়েছে। মনে হয় এছাড়া কিছুই না।

মারিয়া ইসলাম মৌরি আরও বলেন, রক্তের বিনিময়ে স্বৈরাচার দমন হয়েছে। আর কিছুই না। শহীদদের সম্মাননা দেওয়ার মতো কিছুই হয়নি। আমরা নতুন সরকারের কাছে আশা রাখি তারা পরিবর্তন করবে।

জুলাই আমাদের কি শিক্ষা দিলো ? এমন প্রশ্নের জবাবে জুলাই শহীদের বোন মৌরি বলেন, কেউ যদি স্বৈরাচারিতা করে তাহলে অবশ্যই পতন হবে একদিন। রক্তের বিনিময়ে হোক আর যেভাবেই হোক। আগামী জুলাইয়ের আগে আমার ভাই শহীদ আব্দুলাহসহ প্রতিটি হত্যার বিচার চাই। এসব হত্যার অনেক ডকুমেন্ট এবং প্রমাণ আছে। শহীদ পরিবার হিসেবে সর্বপ্রথম চাওয়া হচ্ছে, জুলাই সনদ আর জুলাই শহীদদের হত্যার বিচার। বিচারটা সবার আগে বাংলাদেশে হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কোন কিছুই হলো না।

শহীদ আব্দুলাহর হত্যার বিচার কোন পর্যায়ে এমন প্রশ্নে মারিয়া ইসলাম মৌরি বলেন, এখন পর্যন্ত কোন পর্যায়ে-ই নেই। এখনও যাচাই বাছাই পর্যায়ে আছে। তদন্ত পর্যন্ত হচ্ছে না। মনে হচ্ছে সরকার শহীদ পরিবারের সাথে নেই। এই যে আমার বাবা মা। তাদের বৃদ্ধ বয়স। বেশিরভাগ সময় তারা অসুস্থ থাকেন। ডাক্তার দেখাতে গেলে বহু ঝামেলা। সরকারের উচিত তাদের পাশে থাকা। তাদের চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়া উচিত রাষ্ট্রের। আমরা চাই জুলাইয়ের সম্মান। আমি মনে করি সরকার ফিফটি পারসেন্ট জুলাইয়ের পাশে। আমরা শহীদ পরিবারে কাছে প্রধান হচ্ছে হত্যার বিচার আর জুলাই সনদ।

প্রসঙ্গত, শহীদ আবদুল্লাহ আল আবীর ২০ সেপ্টেম্বর ২০০১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মিজানুর রহমান ও মায়ের নাম পারভীন সুলতানা। ১৯ জুলাই, ২০২৪Ñ ঢাকা মহানগরজুড়ে ছাত্রসমাজ রাজপথে নামে। উত্তাল হয়ে ওঠে বসুন্ধরা, নর্দ্দাসহ বিভিন্ন এলাকা। এই দিনে গুলীবিদ্ধ হন শহীদ আবদুল্লাহ আল আবীর। নর্দ্দা এলাকায় পেটের পাশে গুলীবিদ্ধ হন।

পরবর্তীতে দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানান, গুলীটি তার কিডনিতে আঘাত করেছে এবং জরুরি অস্ত্রোপচার ছাড়া বাঁচানো সম্ভব নয়। দীর্ঘ চার ঘণ্টার অপারেশনে একটি কিডনি অপসারণ করা হয়। ২০ জুলাই সকাল ৮:৩০ মিনিটে শহীদ আবীর শাহাদাতের পেয়ালা পান করেন।