শহীদ শরিফ ওসমান হাদীর বোন মাসুমা হাদী বলেছেন, শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে দুটি চাওয়া একটি হচ্ছে শহীদদের হত্যার বিচার করতেই হবে। আরেকটি হলো জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতেই হবে। একদিকে বিচার আদায়; অন্যদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন। এই দুটি কাজ হলে আমার আর কোনো কিছু চাই না। তিনি বলেন যে জুলাই আমার জীবনে আশির্বাদ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই জুলাই এখন আমার জীবনে ভিন্ন রকম হয়ে এসেছে। কারণ জুলাইকে কেন্দ্র করেই ওসমান হাদীর শহীদ হওয়া।

জুলাইয়ের মূল্যায়ন করতে গিয়ে দৈনিক সংগ্রামের সাথে আলাপকালে মাসুমা হাদী বলেন ইতিহাসে ৪৭ রয়ে গেছে। ৭১ রয়ে গেছে। জুলাই আরেকটা সেরকম ইতিহাস। আমি বলতে চাই যারা ২৪ আর ৭১কে মুখোমুখি দাঁড় করাতে চান. তাদের মুখোশ উন্মোচন করতে চাই এই বলে যে, এদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিয়ে সংশয় আছে। এরা আদৌ বাংলাদেশের নাগরিক কি-না। এরা ভারতে দালাল। কোনোটার সাথে কোনোটার মিল নাই। আমাদের ৪৭ না হলে ৭১ হতো না। ৭১ না হলে ২৪ হতো না। প্রত্যেকটার আলাদা আলাদা গুরুত্ব আছে।

দেশে অনেকগুলো আন্দোলন হলো। একেকটার একে উদ্দেশ্য। কিন্তু দেখা যাচ্ছে আমরা এসব আন্দোলন থেকে শিক্ষা নেই না। এমন প্রশ্নের জবাবে মাসুমা হাদী বলেন, ২৪ এর শিক্ষা একটাই স্বৈরাচার হওয়া যাবে না। স্বৈরাচারকে বাংলাদেশের মানুষ কখনো মেনে নেয়নি। ভবিষ্যতেও কখনো মেনে নিবে না। স্বৈরাচার হয়ে কেউ টিকতে পারবে না। এই দেশে রাজনীতি করতে হলে জনগণের আবেগ বুঝেই রাজনীতি করতে হবে।

নতুন বলেন পুরনো বলেন যারাই রাজনীতি করতে আসবে; তাদের বুঝতে হবে জনগণ কি চায়। আমি বলছি জনগণের পাল্স বুঝতে হবে। এই দেশের মানুষ কারো কাছে বর্গা দিতে চায় না। কারো দাসত্ব চায় না। এটা জনগণ যে মানবে না তা বার বার দেশের জনগণ প্রমাণ করেছে। আমি বলতে চাই এদেশের রাজনীতিবিদরা জুলাইকে ধারণ করুক। তা না হলে দেশে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা হবে। এই যে দেশের মানুষ বিপ্লবের জন্য জীবন দিয়েছে। না হলে এদেশের মানুষ কতবার জীবন দিবে। প্রশ্ন রাখেন জুলাই শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর বোন।

বাংলাদেশে কালচারেল বিপ্লবের জন্য শরীফ ওসমান হাদী কাজ করে গেছেন। বাংলাদেশে কালচারেল বিপ্লবকে সামনে এগিয়ে নিতে কি পরামর্শ দিবেন। এমন প্রশ্নের জবাবে হাদী পরিবারের এই নারী সদস্য বলেন, আগেতো মানুষ জানতোই না কালচারেল ফ্যাসিজমটা কি? এটা মানুষ আগে জানতোই না যে রাজনীতি কালচার সৃষ্টি করে না। কালচার রাজনীতি সৃষ্টি করে। আমার ভাই যে কাজ শুরু করেছে সেইকাজ ধরে রাখতে হবে। সরকারী দল বলেন বিরোধী দল বলেন প্রত্যেককে এই বাংলাদেশপন্থী কালচারকে ধারণ করতে হবে। প্রত্যেকটা নাগরিককে করতে হবে। এবং সারাদেশে কালচারেল বিপ্লব করতে হলে প্রত্যেক বিভাগে বিভাগে বাংলাদেশপন্থী কালচারেল সেন্টার স্থাপন করতে হবে। যেটা ওসমান হাদী দেখিয়ে গেছে। বিশেষ করে ঢাকায় ওসমান হাদী একটি কালচারেল সেন্টার তৈরি করেছে। ঢাকাতে আরও অনেক কালচারাল সেন্টার তৈরি করা দরকার। যারা রাজনীতি করে আর যারা রাজনীতি করে না যারা সবার এই সেন্টার ঘুরে ঘুরে দেখতে হবে। দেখবেন উদিচি এবং ছায়ানটের মতো প্রতিষ্ঠান কিন্তু আর তৈরি হয় না। তারা কিন্তু ক্ষমতায় আসতেছে না। কিন্তু ক্ষমতায় কে আসবে সেই কলকাঠি নাড়ছে। এটাই ওসমান হাদী বুঝিয়ে দিয়ে গেছে।

প্রসঙ্গত ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের পর তার বিচার চেয়ে সামনে আসেন মাসুমা হাদী। তিনি বার বার ভাই হত্যার বিচার চেয়ে আন্দোলন করছেন। হাদীর কাজগুলোকে সামনে এগিয়ে নিতে অবিরাম লড়াই করে যাচ্ছেন। কিছুদিন আগেও সুষ্ঠু বিচার এবং জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও আহতদের পরিবারের প্রতি ইনসাফ নিশ্চিত করা না হলে দেশে আবারও জুলাইয়ের মতো গণঅভ্যুত্থান নেমে আসবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তার বোন মাসুমা হাদী।

মাসুমা হাদী অভিযোগ করেন, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও তার ভাই হত্যার বিচারিক প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনে যারা প্রাণ হারিয়েছেন এবং যারা পঙ্গুত্ব বরণ করে চিকিৎসাধীন আছেন, তাদের পরিবারও এখনো প্রকৃত ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত বলে তিনি দাবি করেন।

শহীদ শরিফ ওসমান হাদীর মৃত্যুর প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রতিবেদনে জানানো হয়, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর দুপুরে তাকে লক্ষ্য করে অতর্কিত গুলি চালানো হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হলে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

সেখানেও তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় গত ১৫ ডিসেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সযোগে তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকাকালীন ১৮ ডিসেম্বর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

পরবর্তীতে হাদীর লাশ দেশে আনা হলে রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় মর্যাদায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির সন্নিকটে তাকে দাফন করা হয়। মাসুমা হাদী তার বার্তায় উল্লেখ করেন, ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে হাদী যে ইনসাফ কায়েমের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তবায়নে রাষ্ট্রকে আরও সক্রিয় হতে হবে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, শহীদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করা হলে জনতা আবারও রাজপথে নেমে আসতে বাধ্য হবে।